ভালোবাসার গল্পঃ
#ছোটগল্পঃ
" বেহিসাবি ভালোলাগা "
প্রদীপ দে ~
অনল লোকাল ট্রেনের একেবারে জানালার ধারে সিটটা পেয়েই বুঝে গেছিল দিনটা আজ তার। ধপাস করে বসে একনাগাড়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিল। হু হু করে ট্রেন চলেছে আর গাছপালা পুকুর ঘর জঙ্গলী লতাপাতারা সামনে থেকে এসে নিমেষে পিছনে চলে যাচ্ছে। বাতাস এক ঝটকায় তার দৃষ্টিকে আবছা করে দিয়ে মাথার চুলগুলোকে একেবারে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে।
কত পুরোনো কথা স্মৃতিকে আঘাত করে আবার ভুলিয়ে দিচ্ছে। অনল বর্তমান কে হারিয়ে অতীতে ফিরে যাচ্ছে। অনল আধুনিক জগতের ছেলে হয়ে সেই পুরানো ছোটোবেলার যৌথ পরিবারের কথা ভুলতে পারেনি।
বালি ষ্টেশন থেকে উঠে ব্যান্ডেল ছুটে চলেছে এক বন্ধুর বাড়িতে। রবিবাসরীয় আড্ডা মারতেই। বাবা মা দেশের কাঁথির বাড়িতে থাকে।কর্মসূত্রে সে বালিতে ভাড়া ঘরে থাকে। মাসে একবার বাড়ি যায়। টাকা দিয়ে আসে। দরকারে সাহায্য করে। একই বোন থাকে ওখানে। অনলকেই বিয়ে দিতে হবে। যৌথ পরিবার ভেঙে এখন ভাগের নির্দিষ্ট জমিতে তাদের ঘর সংসার।
নানান চিন্তার মধ্যে একটা কিরকম গন্ধ নাকে এলো, মুখ ঘুরিয়ে দেখলো পাশে এসে বসেছে একটি মেয়ে। বছর পঁচিশের মতো হবে। রোগাটে চেহারায় উজ্জ্বল কালো আর মুখটা বেশ কালী ঠাকুরের মতোই। একপলক দেখার পর বার তিনেক ঘুরে দেখে অনলের তাই মনে হয়েছে। কমদামী নীল হলুদে সিল্কের শাড়িতে খুব যে খারাপ লাগছে তা নয়। তাই অনলের মনে হচ্ছে একটু দেখি না। নারীও তো প্রকৃতিরই অংশ।
অনেক্ষণতো জানালা দিয়ে সবুজ পৃথিবীর রূপ দেখলাম এবার এক অন্য অনুভূতির দিকে যাই না।
ঘন ঘন ঘুরে ঘুরে দেখা মেয়েটিকে বিব্রত করে তুললো। মেয়েটি অসুস্থার ভান করে চোখ বুজে সীটে মাথা এলিয়ে দিল। অয়ন আরো বিব্রত বোধ করলো। বুদ্ধি আর ভয়ের লোপ পেল। সাহস করে জিজ্ঞাসা করে বসলে, --
-- কি হলো শরীর খারাপ লাগছে?
মেয়েটি চোখ খুলেই বুঁজে নিল। কোন উত্তর দিল না।
অয়ন ক্যাবলার মত চেয়ে রইলো। মনটা চিনচিন করে উঠলো। এ মেয়েতো কোন উত্তরই দেয় না। আজ অয়নের কি যে হলো? এরকম তো সে কোনদিন মেয়ে দেখে পাগলামি করে না, বরং মেয়েদের সে এড়িয়েই চলে। কারোর মুখের দিকেও তাকানো তার রুচিতে বাঁধে। তবে আজ কি হলো?
তাও যে খুব সুন্দরী মেয়ে, এ তাও নয়।
এইসব ভাবার মধ্যেই মেয়েটি হঠাৎই চোখ মেলে দিল। কটকটে চোখে অয়নকে একপলক মেপে নিল -- বারবার ঘুরেফিরে দেখছিলেন কেন? মেয়ে দেখা অভ্যাস? না কি আমি দেখতে কুৎসিত তাই?
অয়নের খারাপ লাগলো, -- তা কেন? আমার তো বেশ ভালোই লাগছে।
রাগী মেয়েটি অবাক হয়ে গেল। মুখটা কেমন যেন প্রসন্ন হয়ে উঠলো, -- সত্যি বলছেন না বানিয়ে মজা করছেন?
অয়ন আঙুলগুলো ঘুরিয়ে, -- যা বাব্বা সবাইকে এক ভাবলেন? আমি কোনদিন কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলেনি, আজ কি জানি কি হলো, তোমাকে দেখে আমার মনে কেমন একটা টান মারলো, মনে হলো তুমি …
কালো মেয়েটি তার আরো গভীর কালো আয়ত চোখে অবাক হয়ে গেল, -- আর তুমি মানে আমি কি ...?
-- থাকগে, ছাড়ো ওসব! তোমার নাম বলবে?
মেয়ে তৈরী ছিল -- আমি হারানী।
-- এ আবার কি নাম? এরকম নাম কারোর হয় নাকি? হা -রা -নী এ কি নাম ?
-- কারোর হয় কিনা জানিনা। তবে জন্মের পর পরই বাপ মা সবাইকে হারিয়েছি, তাই।
-- আমার নাম জানতে চাও না?
-- হ্যাঁ খুউব -- হারানীর চোখে কৌতুহল।
-- আমি অয়ন। তবে আমি তোমায় শুধুই রানী বলেই ডাকবো।
-- ওহঃ তাই বুঝি! কিন্তু আমি তো একা। আমার নিজের কেউ নেই। আমি একজনের বাড়িতে থেকে কাজ করি। অসুবিধা হওয়ায় নতুন কাজের সন্ধানে যাচ্ছি।
-- যেখানে থাকো সেখানের অসুবিধা কি?
-- বৌদি খুব ভালো। দাদা বৌদিকে লুকিয়ে অসভ্যতা করে।
অয়ন চমকে ওঠে কথাগুলো শুনে আবার বড় ব্যাথা পায় - পুরুষের কীর্তিতে। কানে বাজে -- বৌদি ভালো কিন্তু দাদা ----?
-- তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
-- তোমার বাড়িতে আর কে কে আছে?
-- এখানে কেউ নেই। সব দেশে। এখানে আমি একা।
রানীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আশার আলো যেন মিলেমিশে যায় তার মুখে।
-- ভয় নেই। আমার বাড়িতে কাজের লোকের দরকার নেই। তোমাকে আমি যদি ----
অয়ন থেমে যায় আর বলতে পারে না। আজ তার কি হলো? সে কি পাগলামি শুরু করে দিল সে নিজেও জানে না। তার দেশের বাড়ি বাপ মা আর এক অবিবাহিত বোন আছে যে! সকলের দায়িত্ব যে তার কাঁধে! সেতো পুরোনো দিনের ছেলে। এই নতুন। জগতের সঙ্গে তো তার কোন মিল নেই। সে তো নিজের জন্য কিছু চায় না, সে চায় যৌথ পরিবার। আজ তাহলে তার এই একার জন্য এই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা অর্থহীন। অবিবেচক মনে হয় নিজেকে। ভালোলাগা আর ভালোবাসাতো এক নয়। বিপদ হতে পারে। একেবারে বাস্তব মানা শিক্ষিত এক যুবকের ক্ষেত্রে এই বুদ্ধি অকেজো এবং সকলের কাছে অগ্রহণযোগ্য এবং পাগলপন্থী। তবুও অয়নের বুদ্ধি জাগ্রত হয় না।অবিবেচকের মতোই আচরণ করে। তাহলে ভালোবাসা কি বুদ্ধিনাশ করে?
সহায় সম্বলহীন জীবনে ভেসে যাওয়া স্রোতে যে কোনো খুঁটি ধরে নেওয়ার বিকল্প থাকে না। রানীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে, অয়নকে লুকিয়ে শাড়ির আঁচলে চোখ মোছে। ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
-- তাহলে তুমি আমায় ………?
দুজনায় সতর্ক হতে চাইলেও তা আর হয়ে ওঠে না।
ততোক্ষণে ট্রেন ব্যান্ডেল ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়েছে। ওরা কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। ঘোষণা হয়ে গেছে এই ট্রেনটি আবার ফিরতি পথে হাওড়া যাবে। হারানী উঠে পড়ে নামার জন্য। অয়ন সময় নেয় না ওর হাতটা ধরে টেনে বসিয়ে দেয়। নিজের কাছে টেনে নেয়। ওর চোখে চোখ রাখে কানের কাছে মুখ নিয়ে যায়, অস্ফুটে বলে,
-- আমরা দুজনায় এখন বালি যাবো, আমার বাসায় ……
হারানী চুপ করে বসে একদৃষ্টিতে অয়নকে দেখতে থাকে। কিছুবাদে ট্রেন যাত্রীতে ভরে যায়।হুইসেল বেজে ওঠে, ট্রেন ধীরগতি থেকে জোড়ে ছোটা শুরু করে। জানালার হাওয়ায় দুজনায় এখন খুব শান্ত!
হারানী অয়নের কাঁধে মাথা ফেলে দেয়, চোখ জুড়ে আসে শান্তিতে! 💘-----------------------------------------


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home