Saturday, 3 July 2021

গল্পঃ ভুতরহস্য

#ভুতরহস্যঃ
  " প্রেম প্রতিশোধ  "
            প্রদীপ দে ~

-- প্রেম জীবন দেয় আবার নেয়ও।

-- সেটা কিরকম?

-- একটা স্বাভাবিক নিয়ম এটা। সব কিছুরই ভালোমন্দ যেমন থাকে এই আর কি!

-- তুমি এরকমই একটা ব্যাখ্যা দাও না --
হরিহরের দাঁড়িভর্তি মুখে এক‌টি আকুতি - আমার কাছে।

-- সে না হোক বলবো - কিন্ত চা না হলেই যে নয় হরিদা ! দেখেছো আকাশ কালো হয়ে গুজরাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকে চমকে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। যেন বলছে সাবধান -সাবধান !

--  কিসের ভয় কিসের?
হরিহরের মুখে প্রশ্নের আর্তি।

-- হরিদা - দেখো, - বলতে বলতে বৃষ্টির খেলা  শুরু হল। যে বাড়িতে আমরা দুজনে বসে আছি তার ইতিহাস তুমি জানো?

-- ইতিহাস ফিতিহাস আমি কিছু জানিনে। আমি শুধু বর্তমান জানি আমি এই ভাঙা কুটিরে ইয়াসের ঝড় জল এড়াতে দুদিন এসে জুটেছি। আমার বেড়ার কুটির এখন বিশবাও জলে। বৃষ্টি এখনো চলছে। কবে নিজের ডেরায় যেতে পারবো তা ঈশ্বরই জানেন। তবে হ্যাঁ একথা ঠিক তোমায় সঙ্গী  হিসাবে পেয়ে ছিলেম বলে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে নিশ্চিত। না হলে এই জলাভূমিতে আর জংলি এই ভাঙা বাড়িতে আমি একা থাকতে পারতুম না। তুমিও আমার মত অসহায় হয়ে এসে আমায় সাথ দিলে তাই সাহস পেলুম!

-- আমি ও অসহায়। ঠিকই বলেছো। তাইতো ছুটে আসি অসহায় কে সাথ দিতে। বাইরে নির্জন জনমানব শুন্য। আমরা দুটি প্রাণী এই কুটিরে জীবন বাঁচতে খাদ্য পানীয়বিহীন হয়ে দিনযাপন করছি স্রেফ যে যার নিজের তাগিদেই।

আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিক ভেসে যাচ্ছে। ঝড় থামার পরেই চলছে এই বারিপাত। হরিহরের কাছে আজ আমি সব বলে দেবো পুরানো কথা। যা আমি জানি।

--  হরিদা - শোনো - বলছিলাম না প্রেম বড়ই পবিত্র।  তবে এর পরিনতি সব সময় সুখের হয় না বা সার্থকতা লাভ করে না মাঝে মধ্যে অভিশস্পাত হয়েও ধরা দেয় বা ফিরে আসে।

হরিদার মুখ বিবর্ণ। ফ্যাকাশে নীল। একেবারে আকাশের মতোই। ঘোর ঘনঘটা। আমার দিকে ওর চোখ হাপিত্যেশ করে দেখতে চায় চাক্ষুষরূপে আমার বলা কথাকাহিনী।

--  সেও এক বর্ষাকাল। এই বাড়ি তখন ছিল একেবারে ঝাঁ চকমকে। চৌধুরীদের পৈতৃক ভিটে।
যৌথ পরিবার। আর তার স্বাদই যে আলাদা। তবে গ্রামের বাড়ি। লোক লস্করে ভর্তি।

বড় ভাইয়ের ছোট ছেলের বিয়ে। বাবা মুকুন্দকিশোর, পাত্র মনজিত আর পাত্রী অনুসূয়া। বউ আজ এসেছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। সানাই বাজছে। গ্রামের সকলের দুবেলা আহারের ব্যবস্থা চলছে  মোট তিনদিনের জন্য। চেঁচামেচি - হৈচৈ ব্যাপার। নানান মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান চলছে নতুন বউকে নিয়ে। বউ ল্যাটা মাছ ধরবে তাই হাড়িতে চাপা দিয়ে মাছ রাখা রয়েছে। এয়োদের একজন যেই সেই হাঁড়ির মুখ খুলেছে ওমনি এক বিষধর কেউটে ফনা উঁচিয়ে ধরেছে। সে এক ভয়ানক পরিস্থিতি। বলে বোঝানো যাবেনা।  ভয়ে কে কি করবে বুঝে ওঠার আগেই বাবা মুকুন্দকিশোর ক্ষিপ্র গতিতে তার হাতের লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে কেউটেটাকে। সাপটা  ছিটকে পড়েও ফোঁস করে মাথা তুলতেই বাগানের মালী যুধিষ্ঠির  গাছ কাটার সরু ধারালো দাঁ দিয়ে ওর মাথায় কোপ বসিয়ে দেয়। সাপটা মাটিতে তিনবার মাথা ঠুকে মারা যায়। ভন্ডুল হয়ে যায় সব অনুষ্ঠান।  আকস্মিক এই ঘটনার জের চলতে থাকে। ভয়ে আর অমংগলের শব্দ যেন সকলকে বিচলিত করে। বারিধারা আরও জটিলতা সূচিত করে।

গ্রামের প্রবীণেরা বেশি জটিলতার সৃষ্টি করে। গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিবাহের রেশ কাটে না চৌধুরীর বড় কর্তা গুঞ্জনের শিকার হন। অসুস্থ হয়ে পড়েন। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।
বাড়ি ফাঁকা হলে নিস্তব্ধতার শক্তি  বাড়ে। বাড়িতে যেন কারোর ঘুমরানো কান্নার আওয়াজ বয়ে যায়। আস্তে আস্তে সকলেই সেই আওয়াজ শোনে। গুনীন আসে ,গুনে  বলে অতৃপ্ত আত্মা বাড়িতে কাঁদছে। সম্ভবত ওই সাপটি মহিলা ছিল এবং গর্ভবতী ছিল। গ্রামের লোকেরা তাই বিশ্বাস করে।

কিছুদিন বাদে মুকুন্দ শয্যাশায়ী থেকে মারা যান। ওই পরিবারের কুনজরে পড়ে গেছিলো অনুসূয়া। সবাই আড়ালে আবডালে তাকে কুলক্ষুনে বলতে লাগলো। কথা থেমে থাকে না। গ্রামে হু হু করে এ প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে যায়। তাই হলো।
যে নতুন বউ মহানন্দে ভালোবাসা দিয়ে সংসার সাজাতে বসেছিল তা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে যায়। অনেক লড়াইয়ে স্বামীর মনেও সন্দেহ পাকাপোক্ত ভাবে বসে গেল। 

অন্যদিকে যে যুধিষ্ঠির মালী সাপটাকে কাটারির কোপ বসিয়েছিল তার গিন্নিকেও একদিন এক বিষাক্ত  সাপ দংশন করে। 
ওঝার শত চেষ্টা তাকে বাঁচাতে পারেনি। কারণ সেটাও ছিল কালকেউটে। ওঝা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্বপ্নে আদেশ পায় সরে যেতে -- এ নাকি মৃত নারী-কেউটেটিরই জোড়া সাপ, পুরুষ-কেউটে। তার উদ্দেশ্য হলো এদের বংশ কে ধ্বংস করে দেওয়া। প্রেমিকার মৃত্যুর প্রতিশোধ। ভালোবাসা থেকে হিংসার জন্ম।

পঁনেরো দিনের মাথায় যখন যুধিষ্ঠির মালী তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দূরে শহরে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে, তখনই ঘুমের মধ্যেই তার ছেলেকে ছোবল বসিয়ে ছেড়েছে সেই ক্ষিপ্ত নাগ। স্বপনে তাকে এই দুঃখ বয়ে বেড়ানোর জন্য বাঁচিয়ে রেখে দিয়েছিল।

হরিহর চোখ মেলে আমাকে ভালো করে মাপলো কয়েকবার। ব্যাপারটা এইরকম তুমি এসব কথা জানলে কি ভাবে ? 

আমি আমার মতো করে বলে যেতে থাকলাম, --

ওদিকে পুত্রবধূ ছিল আসন্ন প্রসবা। স্বামী মনোজিত তখন স্ত্রীর প্রতি অনেকটাই অনুরক্ত।
গর্ভবতী খবরে বংশবৃদ্ধির আশায় স্ত্রীকে নতুনভাবে ভালোবাসতে শুরু করেছিল। কিন্তু  অনুসূয়া চেয়েছিল এই পরিবার কে আর তার স্বামীকে একটু শিক্ষা দিতে। প্রসবের সময় বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার ব্যবস্থা তাই আগেই করে রেখেছিল।
কিন্তু নিয়তি, ভাগ্য আর অভিশাপ এই তিন মেল্বন্ধনের জের তাকেও মেটাতে হলো ওই কাল কেউটের ছোবলেই। এতদিনে বোধহয় ওই কেউটে
শান্তি পেল তার প্রতিশোধে। তার গর্ভবতী স্ত্রীর মৃত্যু বদলা নিল, মনোজিতের স্ত্রী গর্ভবতী অনুসূয়া বৌয়ের মৃত্যু  ঘটিয়ে।

এসব কথা জানা গেছিলো গুনীন মারফত। পুরুষ কেউটেটি পরপর বদলা নেওয়া চালিয়ে গেছে যতোক্ষন পর্যন্ত  না, এই বংশের গর্ভবতী কোন মহিলার প্রান নিতে পেরছে। তবে ওই বাড়ির অভিযুক্ত আর অভিশপ্ত দুইজন পুরুষকে সে বাঁচিয়ে রেখেছিল স্রেফ নিজের স্বার্থেই। এই দুজনের একজন মনোজিত অন্যজন ওই মালী যুধিষ্ঠির।  দুই ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রেখে তার পরিবারকে শেষ করে দিয়ে তার যন্ত্রনা বোঝাতে চেয়েছিল, যেমনটি সে পেয়েছিল।  ভালোবাসা তার সার্থক। প্রেমের মৃত্যুর  ক্রোধ আর তার প্রতিশোধ যার অন্য রূপ হিংস্রতা! এরপর থেকে ওই সাপকে আর কেউ দেখতে পায়নি।

হরিহর প্রশ্ন করে --  মনোজিতকে আমি চিনি। সে একজন জানি। যে সব ছেড়ে দেশান্তরে। বাড়ির অন্যান্যরা অনেকে আগেই মরে, পালিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু অন্যজন ওই যুধিষ্ঠির মালী কোথায় হারিয়ে গেল?  তার আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে সব ছেড়ে পালিয়ে যাবে?

আমি নিরুপায়। আবার আজ আমায় সব বলে দিয়ে হালকা হতেই হবে -- এই ছিলো আমার ইচ্ছে। তাই বাকী না রেখে হরিহরের কাছে স্বীকার করেই নিলাম, ---

--  আমিই সেই দ্বিতীয়জন -- সেই বাগান মালী -- যুধিষ্ঠির !

বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে চলেছে , সব বুঝিবা ভাসিয়ে দেবে ……  দিক সব ভাসিয়ে……… ।
------------------
#অমাদীপ_প্রদীপদে

Labels:

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home