রহস্যময় জগন্নাথ
👑রহস্যময় জগন্নাথ
~~~~~~~~~~~~
প্রদীপ দে ~
আজ রথ।
জগতের নাথ শ্রী বিষ্ণু জগন্নাথ রূপে ~
মহাকাল মহাদেব বলরামের বেশে ~
মহামায়া দেবী শক্তি শুভ্রদা ……
তিন মহাশক্তির মিলন পথে নামেন রথে চড়ে সকল জাতির সকল মানুষের মিলনমেলায় -- যা সাধারণত আমার কাছে রহস্যময় এক বিষয় -- কেবলই রথযাত্রা নামে প্রতিভাসম্পন্ন এক উৎসব হিসেবে নয়।
সচরাচর প্রথাগত পুজোয় উনি সন্তুষ্ট নন। তাই চৈতন্যদেব থেকে আরো অনেক মুনী ঋষি তাঁকে তাদের বিভোর প্রেমে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। কতশত কবি লেখক গায়ক গীতিকার জগন্নাথদেবকে নিয়ে তাদের কলম ধরে ছিলেন। লিখে গেছেন তাঁদের অমর কাব্য, গীত, রচনা। সেইসব অমর সৃষ্টি তাঁদের পুস্পাঞ্জলি তাঁদের পুজো এই মহাশক্তিধরের চরণেই নিবেদিত। আমার এই লেখাই আজ তার পুজো। সোজারথ থেকে উল্টোরথ এই পাক্ষিকে আমার এই লেখা চলবে ভগবানের উদ্দেশ্যে আর তার প্রসাদ আপনারাভগবান ভক্তবন্ধুরাও আস্বাদন করবেন এই আশা রাখি। কারণ ভক্তই !
শ্রী বিষ্ণু হিমালয় অবস্থান করার পর ধরায় মর্ত্যলোকে নেমে চারিধামে আসেন।
এই তীর্থক্ষেত্র গুলির প্রথমে আসেন বদ্রীনাথধামে এখানে তিনি স্নান সারেন।
দ্বিতীয়ধাম দ্বারিকাধামে উনি বস্ত্র গ্রহন করেন।
তৃতীয়ধাম পুরীধামে এসে ভোজন করেন। কারণ এখানেই মা অন্নপূর্ণা থাকেন। এখানেই অন্নপূর্ণার পক্কশালা আছে।
চতূর্থধাম রামেশ্বরধামে গিয়ে শ্রী বিষ্ণু বিশ্রাম নেন।
এইজন্য এই চারিধাম আমাদের কাছে মহান তীর্থক্ষেত্র।
শ্রী কৃষ্ণই হলেন শ্রী জগন্নাথ মহাপ্রভু। শ্রী কৃষ্ণ মৃত্যুর পূর্বে এই পুরীধামেই অবস্থান করেছিলেন।
স্কন্দপুরানে ভগবান জগন্নাথ দলিত শবর জাতির প্রধান উপাস্য দেবতা ছিলেন। নীলাঞ্চল পর্বতের এক গুহায় শবরেরা তাঁর পুজো করতো। ওনাদের প্রধান পুরোহিত ছিলেন দলিত বিশ্ববসু। এই পুরোহিতদের দ্বৈতাপতি বলে। জগন্নাথ এই নিন্মজাতির হাতেই পুজো নিতেন। তিনি জগতের নাথ। তাই ওনার গায়ের রঙও কালো।
পরে মালাবারের রাজা ইন্দ্রযুগ্ম স্বপ্নাদেশ পান যে জগন্নাথ নীলপাহাড়ের এক গুহায় রয়েছেন। ওনাকে পুরীধামে এনে প্রতিষ্ঠা করে পুজোর আদেশ দেন।
তখন পুরী নগরী ছিল এক বিখ্যাত বাণিজ্য সমূদ্র উপকূল বন্দর।
ইন্দ্রযুগ্ম তার প্রধান পুরোহিতের সাহায্য নেন। কারণ উনি বুঝতে পেরেছিলেন বিপদ হতে পারে। কাবিল নামক নিন্মজাতির লোকেরা ওনার মূর্তিটিকে পূজো করে বলে খবর ছিল। তাই রাজা ইন্দ্রযুগ্ম ওনার প্রধান পুরোহিত বিদ্যাপতির সাহায্য চান। সৈন্য লোকলস্কর সহ বিশ্ববেতাকে নিয়ে মূর্তিটি উদ্বার করেন।
অন্যদিকে জগন্নাথের শবর ভক্ত প্রধান পুরোহিত বিশ্ব বসু দুঃখে ভেঙ্গে পড়েন। জগন্নাথ দেবও কষ্ট পান। পুনরায় স্বপ্নে রাজাকে নির্দেশ দেন মূর্তিটি ফিরিয়ে দিয়ে আসতে। রাজা ভয় পেয়ে ফিরিয়ে দেন। জগন্নাথ যে জগতের সকলের নাথ!
এরপরই শুরু হল পুরীধামে জগন্নাথের পাকাপোক্ত ভাবে অবস্থানের কাহিনী…………।
জগন্নাথ মূর্তি নীলপাহাড় থেকে উদ্বারের পিছনে আরো কাহিনী আছে। রাজার পুরোহিত বিশ্ববেতা জানতেন শবরদের পুরোহিত বিশ্ব বসু জগন্নাথের প্রিয় পাত্র। জগন্নাথ ওনার হাতেই পুজো নেন। তা অতি সহজে ওই পর্বতের গুহা থেকে সে মূর্তি আনা সম্ভব নয়।
তখন রাজার পুরোহিত ছল করে শবর বিশ্ববসুর কন্যাকে বিবাহ করেন। স্ত্রীর সাহায্যে বিদ্যাপতি জানতে পারেন কোন গুহায় সে মূর্তিটি আছে। এবং সুযোগ বুঝেই সেই মূর্তি চুরি করেন। কিন্তু পরবর্তী কালে জগন্নাথের নির্দেশে এবং ভয় পেয়ে রাজা ইন্দযুগ্ম তা ফেরত দিয়েও আসেন।
কিন্তু রাজা তাতে হতাশ না হয়ে পুরীতে মন্দির নির্মাণ করার কাজে লিপ্ত হন। এবং জগন্নাথ দেবকে ফিরে আসার আকুতি জানান।
ভগবানের লীলা বোঝা দায়! আবার স্বপ্নাদেশ আসে মন্দির তৈরি হলে দ্বারিক থেকে সমুদ্রে যে নীম কাঠ ভেসে আসবে তা থেকেই তার মূর্তি তৈরি করতে হবে। মন্দিরের কাজ শুরু হয়। বিশাল তার কাজ। অনেক শিল্পকলা ছিল তার পরিকল্পনায়। প্রতিটি শিল্পের বা কাজের পিছনে বিরাট সব কাহিনী বা ইতিহাস আছে সে সমস্ত গল্প আলাদা।
সত্য যুগেঃ ভগবান উত্তর ভারতের বদ্রীনাথে শ্রী নারায়ণ রূপে আভির্ভূত হন।
দ্বাপর যুগেঃ দ্বারকা ধামে শ্রীদ্বারকানাথ রূপে প্রকটিত হন।
ত্রেতা যুগেঃ দক্ষিণ ভারতে রামেশ্বরে শ্রীরামচন্দ্র রূপে লীলাবিলাস করেন।
কলিযুগেঃ পুরীধামে ভগবান শ্রীজগন্নাথ বিগ্রহ রূপে প্রকটিত হয়েছেন।
চারধামের মধ্যে জগন্নাথ পুরী ধাম সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত। পুরীধাম শঙ্খ ক্ষেত্র নামে পরিচিত।
অন্য গুলির মধ্যে ভুবনেশ্বর চক্র ক্ষেত্র
যাজপুর গদা ক্ষেত্র ও
কোনারক হচ্ছে পদ্ম ক্ষেত্র
স্কন্দ পুরান অনুসারে পুরীধাম নৃসিংহ ক্ষেত্র নামেও খ্যাত।
এদিকে রাজা ইন্দ্রযুগ্ম মন্দিরের কাজ সমাপ্ত হলে জগন্নাথদেবের শরণাপন্ন হলেন। জগন্নাথ মন্দির দেখে খুশি হন এবং স্বপ্নে আদেশ করেন নতুন মূর্তি বানানোর জন্য। বলেন দ্বারিকা থেকে পুরী সমুদ্রে ভেসে আসা নীমকাঠ দিয়েই তাঁর মুর্তি বানাতে হবে। একজন মুর্তি নির্মাণের জন্য প্রেরিত হবে।
জগন্নাথ বিশ্বকর্মার উপড় সেই দায়িত্ব দিলেন। এটা রাজাকে জানালেন না।
রাজা কিছু জানলেনও না। বিশ্বকর্মা ছদ্মবেশে তার কাছে এলেন। এবং দায়িত্ব নিলেন কয়েকটি শর্তে।
শর্তাবলী হলো:
১) উনি ওনার মত মূর্তি বানাবেন।
২) মোট ২১ দিন সময় লাগবে।
৩) উনি বন্ধ ঘরে একলা এই কাজ করবেন।
৪) কেউ ওই ঘরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
নিয়ম ভাঙা হলে উনি আর কাজ করবেন না। চলে যাবেন।
রাজা রাজি হলেন। বদ্ধ ঘরে মূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হলো……………
বিশ্বকর্মা দরজা বন্ধ করে দিলেন, নীম কাঠ আর যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে। রাজা ইন্দ্রযুগ্ম আর রানী গুন্ডিচা ভাবলেন যে উনি কি করেন দেখাই যাক! মনে সন্দেহ পুষে রাখলেন। রাজার লোকলস্কর সবাই অবাক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমান। প্রতিদিন ছেনী হাতুড়ির শব্দে সবাই জাগ্রত ছিল। এমনি করে ১৯ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল।
কুড়ি দিনের দিন থেকে আর কোন শব্দ শোনা গেল না। সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। রানী গুন্ডিচা দৌড়ে এলেন। দরজায় কান পাতলেন - না কোন শব্দ নেই। রানীমা ভয় পেয়ে গেলেন। রাজার কাছে খবর গেল। রাজাও ছুটে এলেন। তাই তো! কি ব্যাপার! ভিতরে কি হলো?
গুন্ডিচা রাজাকে বললেন বৃদ্ধ বোধহয় মারা গেছেন। একনাগাড়ে কাজ আর বাতাসবিহীন ঘরে সম্ভবত উনি দেহ রেখেছেন। আর দেড়ি করে লাভ নেই। দরজা এখনি ভাঙুন - নচেৎ আরো বিপদ আসন্ন।
রাজাও তাই ভাবলেন। আদেশ করলেন দরজা ভেঙে ফেলার। তাই হল, সৈন্যরা দরজা ভেঙে ফেললো।
অবাক কান্ড! একি!
ভিতরে যে কেউ নেই। বৃদ্ধ কারিগর উধাও……
আর তিনটি কাঠের অর্ধনির্মিত মূর্তি। জগন্নাথ বলরামের অর্দ্ধ হাত আর শুভদ্রা হাত পা বিহীন।
সকলেই বুঝে গেলেন এই বৃদ্ধ আসলে ভগবানই ছিলেন। তিন তাঁর কথামত চলে গেছেন।
রাজা বিপদে পড়ে গেলেন। এ আমি কি ভুল করলাম! চিন্তায় পড়ে গেলেন এই মূর্তির শেষ কে করবে?
জগন্নাথের লীলা বোঝা দায়!
মানুষের কি সাধ্য তাকে জানা!
স্বপ্নাদেশ এল রাজার কাছে - আমার এই মূর্তিকেই পুজো করো। মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করো।
তাই হলো। মন্দির জাগ্রত হলো।
কলিযুগে এই মূর্তির বিশেষ মহিমা!
কলির মানুষের জন্য কিছু করার ক্ষমতা নেই - ভগবান নিজেই হাত পা বিহীন - এই বুঝিবা আমাদের জন্য ভগবানের শেষ ব্যাখ্যা -ভবিতব্য!
সেই থেকেই জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রার এই হাত পা বিহীন মুর্তিই পুরীর মন্দিরে অবস্থান করছেন এবং পূজিত হচ্ছেন। ওঁনার মাহাত্ম্য পুরীধামকে এক মহান তীর্থক্ষেত্র রূপে মানুষের হৃদয়ে প্রকটিত করেছেন।
এরপর অবশ্য জগন্নাথ কল্কি অবতার হয়ে অর্শ্বারোহনে অত্যাচারের অবসানে হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন - সেই দিন বোধহয় হবে আরো ভয়ংকর! সেই মন্দির এখন নির্মানাধীন!
একটা কথা বলে রাখি এই যে নীম কাঠ দিয়ে জগন্নাথ মূর্তি তৈরী করা হলো- এখানেও রহস্য আছে।
সমুদ্র তটে নীম গাছের গুঁড়ি ভেসে এলো। রাজা তার লোকের সাহায্যে ওই গাছ তুলতে গেলে বাঁধা পায়। হাজারো চেষ্টা করেও ওই কাঠ তোলা সম্ভবপর হয়নি। রাজা বুঝতে পারেন এটা ঠাকুরের লীলা। উনি সঙ্গে সঙ্গে নীলমাধবের পরম ভক্ত জগন্নাথের প্রথম পুজারী শবর বিশ্ব বসুর শরণাপন্ন হন। বিশ্ব বসু এসে সেই কাঠ একাই কাঁধে চাপিয়ে, সমুদ্রের জল থেকে পাড়ে নিয়ে আসেন। এও ভগবানের অন্য এক লীলা। দলিত জাতির প্রতি জগন্নাথের ভালোবাসা।
তারপরের ঘটনা আগেই লিখেছি।
জগন্নাথ দেবের ইচ্ছানুসারে এই মূর্তি ১২ বছর অন্তর বদল করে নতুন মূর্তি তৈরী করা হয়। যে নীম কাঠ থেকে এই মূর্তি তৈরী হয় তা আবার বিশেষ লক্ষনযুক্ত হয়ে থাকে।
১) তিন মূর্তির জন্য তিন রঙের কাঠ নির্বাচিত করতে হয়।
২) এই কাঠের গাছ শশ্মানে চার মাথার মোড়ে অবস্থিত হতে হবে। অথবা চার পর্বতের মাঝে বেলপাতা সম্বলিত হতে হবে।
৩) গাছের নীচে গুঁড়িতে অতি অবশ্যই সাপের বাসা বা গর্ত থাকতে হবে। অথবা নিদেনপক্ষে পিঁপড়ের বাসা থাকা বাঞ্ছনীয়।
৪) জগন্নাথের গাছের কান্ড চারটি শাখায় বিভক্ত হওয়া জরুরী।
যে মূর্তি নতুনভাবে রূপ নেবে তা পুরোনো মূর্তির স্থলাভিষিক্ত হবে। আর পুরোনো মূর্তি মন্দিরের পাশেই রক্ষিত অন্তিম শয়ান স্থানে মাটিতে কবর দিতে হয়। তবে তার আগে পুরানো মূর্তির প্রান নতুন মূর্তি তে প্রতিস্থাপন করতে হয়। এই কাজ বড় কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে করতে হয়।
আসল কথাটি বলি - শ্রীকৃষ্ণ র মৃত্যু এই পুরীতেই হয়েছিল। ওঁনার দেহ পঞ্চভুতে বিলীন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু হৃদয় পুরীতেই রয়ে গেছিল। তাই জগন্নাথ এখানেই সেই হৃদয়ের উত্তরাধিকারী হন।
এইজন্যই অনেক নিয়ম। অনেক সংস্কার আর কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়, নতুন মূর্তি গঠনের সময়।
মূর্তি গুলি তৈরী হয়ে গেলে শুরু হয় পুরোনো মূর্তি থেকে শ্রীকৃষ্ণর হৃদয় নিয়ে নতুন মূর্তিতে প্রতিস্থাপন করার কাজ।
গোটা পুরী শহর সেদিন কার্ফিউ জারি করে ব্ল্যাক আউট করে দেওয়া হয়। সি আর পি এফ বাহিনী দিয়ে পুরো জনজীবনকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
নির্বাচিত পুরোহিতের চোখেমুখে ফেট্টি বেঁধে গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান একা উনি এই প্রান প্রতিস্থাপনের কাজটি করেন, একেবারে অন্ধের মতোন কোন এক ঈশ্বরের অঙ্গুলি হেলনে।
পুরো ঘটনা ঘটে এক রহস্যময় পরিব্যাপ্তিতে যা সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়। এর মাপ পরিমাপ হয় না। এখানে বিচার চলে না। তর্ক আসে না। আছে শুধু বিশ্বাস আর আজন্ম ভালোবাসা।
মুনীঋষিদের দেশ এই ভারতবর্ষ। এখানের সব কিছুই এক অনুভূতি কাজ করে যেখানে থাকে অপরিসীম বিশ্বাস আর ভালোবাসার সেতুবন্ধন।
এখন দিন অনেক পাল্টে গেছে ………
হয়তোবা কলিদেবতার তাই-ই ইচ্ছা ………
১২ বছর অন্তর বিগ্রহ পরিবর্তন করার নিয়ম। নতুম বিগ্রহ তৈরী হয়ে গেলে প্রধান পুরোহিত চোখ বুঝে হাতে দস্তানা পড়ে পুরোনো বিগ্রহ থেকে প্রান নিয়ে নতুন বিগ্রহে প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় তিনি কিছুই দেখতে পারেন না, শুধুমাত্র দস্তানা হাতে অনুভব করেন খরগোশের মত কিছু একটা ধকধকে পদার্থ। এটিকে ব্রাহ্ম পদার্থ বলে। সেটিকে তিনি নতুন বিগ্রহের হৃদয়ে দিলেই তা মিলিয়ে যায়। বড় অদ্ভুত ব্যাপার।
এই রহস্য আজো গোপনীয়। কেউ জানে না। আর কথিত আছে কেউ জানবার চেষ্টা করলে সে তক্ষনাৎ খন্ডে খন্ডে বিভক্ত হয়ে নিছক মাংসের ঢেলায় পরিণত হয়ে যাবে।
আসলে এটিই শ্রীকৃষ্ণের প্রান। আর এটিকেই ব্রাহ্ম পদার্থ বলে। শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় এ ভাবেই পুরীতে চির প্রকাশিত।
জৈষ্ঠ্য মাসের পূর্ণিমা থেকে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা পর্যন্ত রথ উৎসব সংক্রান্ত মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
এই সময় মন্দিরের দায়িত্ব পায় সেই দ্বৈতাপতিরাই, যাদের কে আমরা দলিত শবর জাতি বলে জানি।
এটাই জগন্নাথ দেবের ইচ্ছা।
রাজা ইন্দ্রযুগ্ম প্রথমে এই রথের পথ সোনার ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁড় দিয়ে দেন। পরে সেই পথেই রথ গড়ায়।
এখনও সেই রীতিতে রাজার পরবর্তী বংশধরেরা সেই কাজ করে আসছেন।
আর রানী ছিলেন গুন্ডিচা। জগন্নাথ দেবের পরম ভক্ত হওয়ায় ভগবান তাকেই মাসির আসনে বসান। মা লক্ষ্মীর সঙ্গে ঝগড়া করে এই মাসির কাছে বছরের ৮ দিন থেকে আসেন। ভগবানও স্ত্রীর সঙ্গে লীলাখেলা করেন। ৯ ম দিনে আবার উল্টো পথে উল্টোরথে স্ত্রীর কাছেই ফিরে আসেন।
জৈষ্ঠ্য মাসে স্নান যাত্রায় পূর্ণিমার দিন স্নান করেই জগন্নাথ জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেন। এবং পটল মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। জ্বর থেকে উঠেই লক্ষ্মীর সঙ্গে ঝামেলা বাঁধান এবং বাইরে যাবার অছিলা খোঁজেন।
আসলে সমগ্র জাতির লোক তাকে দেখতে চায়, তাকে ছুঁতে চায় কিন্তু তাতে তো বাঁধা অনেক। নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র হিন্দুদেরই মন্দিরে প্রবেশাধিকার রয়েছে। বছরের মাত্র এই দুদিন এই সোজারথ আর উল্টোরথ এই দিনেই সব জাতির সব লোক তার দেখা পায় তার রথের দঁড়ি ছুঁতে পারে।
অন্য প্রান্তে গুন্ডিচা মন্দিরেও ৮ দিন ধরে চলে এই উৎসব।
আর এই সুযোগে পুরীর মূল মন্দিরে রক্ষনাবেক্ষনের কাজ সারা হয়। সারাবছরের ব্যবহৃত রান্নাঘর পূণর্নির্মাণ করা হয়।
জগন্নাথ যে রেগে গিয়ে, যাওয়ার আগে মা লক্ষ্মীর রান্নাঘর ভেঙ দিয়ে যায়!
আজ আরো একটি পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরবো। জগন্নাথের রূপ আর জন্মবৃত্তান্ত আমি আগেই লিখেছি। কিন্তু এব্যাপারেও দ্বিমত আছে। আজ সে কথাই আলোচনা করবো।
হিন্দুদের যত দেবদেবী আছেন জগন্নাথ তাদের মধ্যে পড়েন না। জগন্নাথ অসাম্প্রদায়িক দেবতা। প্রচলিত কোন সম্প্রদায়ের দেবতাদের মধ্যে উনি পড়েন না। বৈষ্ণব, শৈব,শাক্ত স্মার্ত - এই চার ধর্মাবলম্বীদের কোনোটার মধ্যেই উনি নেই। অথচ সকলেই তাঁর পুজো করেন। বৌদ্ধ, জৈন এরাও পুজো করেন। ওরা অনাকে ভগবান বৌদ্ধ ভেবে পুজো করেন। তবে ওনেকেই ওনাকে বিষ্ণুর নবম অবতার বলে চিহ্নিত করেন আর বুদ্ধদেবের সঙ্গে এক করে দেখেন।
গল্পটি এইরকম :
বৃন্দাবনে গোপীরা কৃষ্ণ কে খুবই ভালোবাসতো। সব সময়েই তারা কৃষ্ণর গুনগান করতো। কৃষ্ণ এসব খুব উপভোগ করতো।
এইজন্য একদিন তারা তাদের বোন সুভদ্রা কে গোপীদের উপর নজর রাখার দায়িত্ব দেয় -যে তারা কি বলছে সব শুনবে আর পরে তা জানাবে।
সুভদ্রা গাছের আড়ালে থেকে সব শুনছিল। আর বড়ই রোমাঞ্চকর সেইসব কথাবার্তা আলোচনা চলছিল।
গোপীরা এসব কিছুই জানতো না - তার নিজেদের মত করে হেসে লুটিয়ে পড়ে কৃষ্ণকে নিয়ে নানান মেয়েলী আলোচনা চালাচ্ছিল।
অন্য দিকে ওই পথ ধরে কৃষ্ণ আর বলরাম আসছিল, ওরাও এই সব ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা আর হাসির রোল শুনে চমকে ওঠে এবং লজ্জায় ওদের হাত পা গুটিয়ে যায় আর চোখ বড় বড় হয়ে গোল গোল হয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ে। অন্য দিকে শুভদ্রারও হাত পা পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে যায়। এই যে অবস্থা ওঁনাদের তিনজনের হয় -এটিই
জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রা র তিন রূপ এই তিনটি রূপেই ওরা কলিযুগে অবতারের আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।
ভগবানের লীলা বোঝা ভার! যেদিক দিয়েই যান না কেন -মূল বিষয় সেই একটাই - বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!
সুতরাং আমরা সেই বিশ্বাস আর ভালোবাসারই দাস !
মন্দিরের প্রতিটি শিল্পকলা নিপূণভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের নানান পৌরাণিক কাহিনীর অবতারণা করে। আমরা খালি চোখে তার মর্ম না বুঝে অশ্লীলতার অর্থ খুঁজে লজ্জা পাই। আসলে এর গভীরতা আমাদের হৃদয় তখনই ছুঁয়ে যাবে যদি একটু ভারতবর্ষের আদি অনন্ত ইতিহাস নিয়ে জ্ঞানার্জনকে কাজে লাগাই।
মন্দিরে বহু দেবদেবীর পৃথক পৃথক মন্দির আছে।তাদেরও নিত্য পুজো হয়। মূল মন্দিরটি অনেক উঁচুতে অবস্থিত। মন্দিরের বাইরে যে লম্বাকৃতি গম্বুজের মাথায় জগন্নাথদেবের বাহন গরুড় পক্ষীকে আমরা দেখতে পাই - উনি যে উচ্চতায় হাত জোড় করে অবস্থান করেন - জগন্নাথ ঠিক সেই সমান্তরাল উচ্চতায় বসে থাকেন।
মন্দিরের উচ্চতা ২১৪ ফুট। আশ্চর্যের বিষয় সূর্যের আলোয় কিন্ত মন্দিরের ছায়া ভুপুতিত হয় না।
মন্দিরের চুড়ায় সুদর্শন চক্র থাকে তা মন্দিরের সমস্ত দিক থেকেই সামনের দিকই পরিলক্ষিত হয়।
মন্দিরের চূড়া দিয়ে কোন পক্ষী আকাশ ভ্রমণ করে না। বিমান চলচলের উপড় বিধিনিষেধ বলবৎ করাই আছে।
এর মস্তকে ধ্বজা লাগানো থাকে। যার অনেক নিয়মাবলী আছে। প্রতিদিন সকালে ধ্বজা লাগাতে হয় এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগে খুলে নিতে হয় । এর জন্য পারদর্শী ধ্বজাধারীও আছে --এটা বেশ কঠিন কাজ! কিন্তু জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদে এই কাজ যেন সহজেই সমাপ্ত হয়।
নিয়ম আছে -- এই কাজ প্রতিদিন ঠিকমতো না হলে মন্দির ১৮ বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে -এইরকম স্বপ্নাদেশ দেওয়া আছে।
মন্দিরের চারিধারে চারটি ফটক আছে। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে মুল মন্দিরের গর্ভগৃহে চলে যাওয়া যায়। গর্ভগৃহে বৈদ্যুতিন আলো জ্বালাবার অনুমতি নেই। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে থেকে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। গর্ভগৃহে উচ্চ বেদীতে রত্ন সিংহাসনে জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রা তিনজন উপবিষ্ট থাকেন। আমাদের বাঁয়ে বলরাম মাঝে সুভদ্রা আর ডানে জগন্নাথ বসেন।
সুভদ্রা সাগরের গর্জনে ভয় পায় তাই তাঁকে মাঝে রেখে দেন দুই ভাই। পুরীতে সমুদ্রের গর্জন অনেক স্থানেই শ্রবণযোগ্য কিন্তু মন্দির প্রাঙ্গণে তা থেমে যায় - সুভদ্রা ভয় পায় -তাই জগন্নাথের এই ব্যবস্থা!
পুরীর সমূদ্র ধারে পুরানো আমলের কাঠের চুল্লী এখনও বিদ্যমান। মৃতদেহ সৎকার এইস্থানে হলে তার পরিণতি আত্মার সুখের হয়। শহরে তার পোড়া গন্ধ প্রায়শই বিরাজমান কিন্তু মন্দিরের মধ্যে তা কোনসময়ে পাওয়া যায় না।
কথিত আছে এই গর্ভগৃহে মূল বেদীর চারদিক প্রদক্ষিণ করলে দুনিয়ার সব ধাম ঘোরার ফল প্রাপ্তি হয়।
মন্দিরের মধ্যেই প্রসাদ বিলির বিশেষ ব্যবস্থা আছে। এখানে ভোগ ক্রয়বিক্রয় হয়। বলরামের ভোগ হয় খুব দামী তাই এই প্রসাদ মহামূল্যবান, তারপর সুভদ্রার ভোগ আর সবচেয়ে কমদামী ভোগ গ্রহণ করেন জগন্নাথ। উনি জগতের নাথ তাই উনি সবচেয়ে সাধারণ ভোগ গ্রহন করেন।
এই বাজারের নাম. " আনন্দ বাজার" ।
মন্দিরে বহু প্রজাতির পাখী সহ হনুমানের লাফালাফি এক বিশেষ প্রযোজনা যেন।
হিন্দুজাতি ছাড়া অন্য ভিন্ন কোন জাতির ভিতরে প্রবেশাধিকার নেই তাই মন্দিরের মূল ফটকে সকলের দৃশ্যমান হওয়ার জন্য কৃপাচার্য হয়ে জগন্নাথদেব ডানহাতে উপবিষ্ট থাকেন যাতে সকলেই মন্দিরের বাইরে থেকে তাঁকে প্রনাম জানাতে পারেন।
ভগবানের লীলা বোঝা ভার! যেদিক দিয়েই যান না কেন -মূল বিষয় সেই একটাই - বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!
ভগবান জগন্নাথ আর মা অন্নপূর্ণার রান্নাঘর দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর আশ্চর্যের রান্নাঘর।
এখানে ৭৫২ টি চুল্লীতে রান্না হয়। ৯ টি ভাগে রান্নাঘর বিভক্ত। ২ টি ভাগ প্রায় ২৫০০ বর্গফুট চওড়া আর ৪ ফুট লম্বা। আর ৭ টি কিছুটা ছোট।
কাঠের আগুন একেবারে নীচে জ্বালানো হয় আর উপড়ে ৯ টি মাটির পাত্রে ওই তাপেই রান্না হয়। এ এক বড় আশ্চর্যের ব্যাপার স্যাপার! আর রান্নাঘরের আলো কাপড়ের সলতের বাতির ঝোলানো আগুন থেকেই আলোকিত হয়। বিদ্যুতের আলো ব্যবহৃত হয় না।
মোট এক হাজার জন রাঁধুনি রোজ কাজ করে। ৫০০ জন সরাসরি রান্নার কাজে যুক্ত থাকে আর বাকী ৫০০ জন সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করে। ১২ বছরের পর থেকেই এদের ট্রেনিং শুরু হয়। এরা সারাজীবন এই ঠাকুরের রান্নার কাজই করে।
সব কাজ হয় মাটির পাত্রে। এই পাত্রগুলি একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া হয়। কয়েকজন শুধুমাত্র এই মাটির পাত্র তৈরী করে কয়েকজন তা রান্নাঘরে আনে কয়েকজন তা ধুয়ে জল ভরে সরবরাহ করে।
রান্নাঘরের মধ্যে দিয়ে গঙ্গা আর সরস্বতী নদীর জল বয়ে চলে। আসলে এটি রূপক। পাইপ লাইনের মধ্যে দিয়ে ভিতরে জল প্রতিনিয়তই সরবরাহের কাজ হতে থাকে।
জগন্নাথ স্থানীয় সব্জি ডাল এইসব ভোগে তৃপ্ত হন।
বলরাম সুভদ্রা একটিমাত্র আলাদা খাবার গ্রহন করেন।
প্রতিদিন ভোগের খরচ আনুমানিক ২ লাখ টাকা লাগে।
ভোগের পর প্রসাদ পান উপবিষ্ট ১০,০০০ জন আর সাধারণ দর্শক ৫,০০০ জন।
ছাপান্নভোগ হল একটি রাজদত্ত অনুষ্ঠান। যেখানে একাধিক মিস্টান্ন দ্রব্য এর ভোগ ছাড়াও ভিন্ন ধরনের ভোগ যা তালিকা কেও অতিক্রম করে যায়। জগন্নাথ দেবের ছাপান্ন ভোগের তালিকাঃ (মিষ্টান্ন ভোগ) ১) জগন্নাথবল্লভ,২) কণিকা,৩) নুনফেনী,৪) ধনুশ্বরন,৫) ফেনা,৬) খড়ি কামড়া,৭) বড়পুরি,৮) বড়নাড়ী,৯) সান নাড়ী,১০) চন্দ্রকান্তি,১১)হংসকেলি,১২) কাকরা,১৩) সান ঝিলি,১৪) পনশুয়া,১৫) বড়ঝিলি,১৬) বড়া,১৭) আরিষা,১৮) মরিচলাড্ডু,১৯) পাগ আরিষা,২০) কাকাতুয়া ঝিনি,২১) তিপুরী,২২) খিরিষা,২৩) অরখফুল,২৪) গজা,২৫) মেনঢাশিঙ্গিয়া,২৬) সরকুম্পা,২৭) চউতাপুরি,২৮) সরুচ কুলি,২৯) নিমকি,৩০) মগজনাড়ু,৩১) খজা,৩২) ডালিম্ব,৩৩) পারিজাতক,৩৪) সরমন্ডা,৩৫) সরভাজা,৩৬) খোয়ামণ্ডা,৩৭) মাণ্ডুয়া,৩৮) অমৃত রসাবলী,৩৯) অমালু, ৪০) বল্লভকোরা,৪১) চড়েইনদা,৪২) সুয়ারি,৪৩) বড় খিরিয়া,৪৪) ছানা মান্ডুয়া, ৪৫) নারিকেল লাড্ডু,৪৬) কড়ম্বা,৪৭)সাতপুরি,৪৮) মাথপুলি,৪৯) ছানাপিঠা,৫০) হংস বল্লভ,৫১) সেবতি ঝিলি,৫২) সর,৫৩) এন্ডুরী,৫৪) সরপাপুড়ি, ৫৫) নড়িয়াখুদি,৫৬) খণ্ড মণ্ডা,৫৭) মহাদেঈ,৫৮) বুঁদিয়াখিরি,৫৯) পিঠাপুলি, ৬০) শ্রীহস্তকোরা,৬১) জেনামণি,৬২) গুড়াখিরিয়া,৬৩) মোহনভোগ,৬৪) সরকাকরা,৬৫) নুনখুরমা,৬৬) কঁলপুলি,৬৭) খইরচুর,৬৮) লক্ষ্মীবিলাস,৬৯) অটকালি, ৭০) বলিবামন,৭১) ছানাচটকা,৭২) চুলিয়া চুপড়া,৭৩) শেউ,৭৪) চুঁচিপত্র,৭৫) চিউতপিঠা,৭৬) পোড়া পিঠা,৭৭) মাখন,৭৮) অতরছমন্ডা,৭৯) সরপণা,৮০) গঁইঠা পিঠা,৮১
উল্টোরথে মাসি গুন্ডিচা দেবীর বাড়ি থেকে …
জগতের নাথ শ্রী বিষ্ণু জগন্নাথ রূপে ~
মহাদেব বলরামের বেশে ~শক্তি রূপী শুভ্রদা একসাথে বাড়ছে ফেরার জন্য তৈরি হন।
জগন্নাথ আর মা লক্ষ্মীর ঝগড়ার খেসারতে যে গৃহত্যাগ করেছিলেন তারা বাড়ি ফিরে চলেছেন……
জগন্নাথ আর লক্ষ্মী এক অভিন্ন রূপ! নারায়ণই এই কলিযুগে লীলা করছেন। সংসার সমূদ্রের ঢেউয়ের ওঠানামা যেন তাদের জীবন-পরিক্রমা।
সবটাই এক রূপকধর্মী অবতারণা।
ইন্দ্রযুগ্মর ধর্মপ্রাণা স্ত্রী গুন্ডিচা দেবীকে মাসি ডেকেছিলেন জগন্নাথ। লক্ষ্মীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে " নিকুচি করেছে তোর সংসারে " এই কথা বলে রেগে রান্নাঘর ভেঙ্গে দিয়ে, মাসির আদর খেতে চলে গেছিলেন। ক্রোধ যে বড় ভয়ানক! বলরাম আর সুভদ্রা যে জগন্নাথের দলে! ওঁনারও ওঁর সাথে গাঁটছড়া বাঁধলেন। পরিণতি রথযাত্রা। এক যাত্রায় বহু ফল!-- সকলের সঙ্গে মিশে যাওয়া। আর লক্ষ্মী মাকে টাইট দেওয়ার এক কৌশল!
কিন্তু তাই কি হয়?
সংসারে গিন্নিকে কি টাইট দেওয়া যায়?
যার হাতে সব জগত সংসারের কলকাটির চাবি!
কিছুই হলো না। মাসির মায়া কেটে গেল। গিন্নিকেই চাই। না হলে যে জগৎ অন্ধকার!
আর মালকড়ি?
সেতো সবই তেনার হেফাজতে --
মাসির ভান্ডার শূন্য করে দিতে তাঁর একমিনিট সময়ও যে লাগে না!
লক্ষ্মী ও কম যান না। বলে -- যা বাইরে একটু ঘুরে আয় - তেল একটু কমুক - তারপর ঠিক আমার পিছনেই ঘুরঘুর করবি -- তখন আমার কদর করবি -- না হলে অবহেলার শিকার হয়ে যাবো যে ?
যদিও সবটাই প্রতীক!
তবুও মহিলারাই এর উত্তর ভালোই জানেন!
উল্টোরথ ফিরে আসছে। জগন্নাথ ফিরে আসছে। মা লক্ষ্মী, মা অন্নপূর্ণা আনন্দে আত্মহারা। নতুন করে রান্নাঘর সাজিয়ে তুলেছেন -- স্বামীকে যে অনেকদিন পরে নিজের হাতে আগের মতোন করে ৫৬ ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন, আর তৃপ্ত হবেন। স্বামী যে তাঁর গুরুর গুরু!
জগন্নাথ আর অন্নপূর্ণা'র মিলন জগতের মঙ্গলের জন্যই একটি শিক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমি নানান বই নানান পরিসংখ্যান ঘেঁটে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আমার লেখক জীবনের এক পুস্পার্ঘ সাজাতে যা জগন্নাথদেবকে অর্পণ করে আনন্দ দিতে চাই সকলকে।
সচরাচর প্রথাগত পুজোয় উনি সন্তুষ্ট নন। মানুষের কর্মই তার পুজো। তাই চৈতন্যদেব থেকে আরো অনেক মুনী ঋষি তাঁকে তাদের বিভোর প্রেমে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। কতশত কবি লেখক গায়ক গীতিকার জগন্নাথদেবকে নিয়ে তাদের কলম ধরে ছিলেন। লিখে গেছেন তাঁদের অমর কাব্য, গীত, রচনা। সেইসব অমর সৃষ্টি তাঁদের পুস্পাঞ্জলি তাঁদের পুজো এই মহাশক্তিধরের চরণেই নিবেদিত। আমার এই লেখাই আজ তার পুজো। সোজারথ থেকে উল্টোরথ এই পাক্ষিকে আমার এই লেখা ভগবানের উদ্দেশ্যে আর তার প্রসাদ আপনারা ভগবান ভক্তবন্ধুরাও আস্বাদন করবেন এই আশা রাখি। কারণ ভক্তই ভগবান!
আপনারা কি বলেন ? পরিশেষে এই একটি প্রশ্ন রেখে গেলাম!
শুভ উল্টোরথ যাত্রা ~
সমাপ্ত । 🙏🙏🙏
বিঃদ্রঃ আমার লিখিত পুস্তক পুরীধামে প্রদানকৃত।
#অমাদীপ_প্রদীপদে
শব্দ : ৩১৫৬
Labels: সাহিত্যপত্র


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home