Tuesday, 3 August 2021

রহস্যময় জগন্নাথ

👑রহস্যময় জগন্নাথ
~~~~~~~~~~~~
               প্রদীপ দে ~

আজ রথ।
জগতের নাথ শ্রী বিষ্ণু জগন্নাথ রূপে ~
মহাকাল মহাদেব বলরামের বেশে ~
মহামায়া দেবী শক্তি শুভ্রদা ……
তিন মহাশক্তির মিলন পথে নামেন রথে চড়ে সকল জাতির সকল মানুষের মিলনমেলায় -- যা সাধারণত  আমার কাছে রহস্যময় এক বিষয় -- কেবলই রথযাত্রা নামে প্রতিভাসম্পন্ন এক উৎসব হিসেবে নয়।

সচরাচর প্রথাগত পুজোয় উনি সন্তুষ্ট নন। তাই চৈতন্যদেব থেকে আরো অনেক মুনী ঋষি তাঁকে তাদের বিভোর প্রেমে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। কতশত কবি লেখক গায়ক গীতিকার  জগন্নাথদেবকে নিয়ে তাদের কলম ধরে ছিলেন। লিখে গেছেন তাঁদের অমর কাব্য, গীত, রচনা। সেইসব অমর সৃষ্টি তাঁদের পুস্পাঞ্জলি তাঁদের পুজো এই মহাশক্তিধরের চরণেই নিবেদিত। আমার এই লেখাই আজ তার পুজো। সোজারথ থেকে উল্টোরথ এই পাক্ষিকে আমার এই লেখা চলবে ভগবানের উদ্দেশ্যে আর তার প্রসাদ আপনারাভগবান ভক্তবন্ধুরাও আস্বাদন করবেন এই আশা রাখি। কারণ ভক্তই !

শ্রী বিষ্ণু হিমালয় অবস্থান করার পর ধরায় মর্ত্যলোকে নেমে চারিধামে আসেন।

এই তীর্থক্ষেত্র গুলির প্রথমে আসেন বদ্রীনাথধামে এখানে তিনি স্নান সারেন।

দ্বিতীয়ধাম দ্বারিকাধামে উনি বস্ত্র গ্রহন করেন।

তৃতীয়ধাম পুরীধামে এসে ভোজন করেন। কারণ এখানেই মা অন্নপূর্ণা থাকেন। এখানেই অন্নপূর্ণার পক্কশালা আছে।

চতূর্থধাম রামেশ্বরধামে গিয়ে শ্রী  বিষ্ণু বিশ্রাম নেন।
এইজন্য এই চারিধাম আমাদের কাছে মহান তীর্থক্ষেত্র।

শ্রী কৃষ্ণই হলেন শ্রী জগন্নাথ মহাপ্রভু। শ্রী কৃষ্ণ মৃত্যুর পূর্বে এই পুরীধামেই অবস্থান করেছিলেন। 

স্কন্দপুরানে ভগবান জগন্নাথ দলিত শবর জাতির প্রধান উপাস্য দেবতা ছিলেন। নীলাঞ্চল পর্বতের এক গুহায় শবরেরা তাঁর পুজো করতো। ওনাদের প্রধান পুরোহিত ছিলেন দলিত বিশ্ববসু। এই পুরোহিতদের দ্বৈতাপতি বলে। জগন্নাথ এই নিন্মজাতির হাতেই পুজো নিতেন। তিনি জগতের নাথ। তাই ওনার গায়ের রঙও কালো।

পরে মালাবারের রাজা ইন্দ্রযুগ্ম স্বপ্নাদেশ পান যে জগন্নাথ নীলপাহাড়ের এক গুহায় রয়েছেন। ওনাকে পুরীধামে এনে প্রতিষ্ঠা করে পুজোর আদেশ দেন। 

তখন পুরী নগরী ছিল এক বিখ্যাত বাণিজ্য সমূদ্র উপকূল বন্দর। 

ইন্দ্রযুগ্ম তার প্রধান পুরোহিতের সাহায্য নেন। কারণ উনি বুঝতে পেরেছিলেন বিপদ হতে পারে। কাবিল নামক নিন্মজাতির লোকেরা ওনার মূর্তিটিকে পূজো করে বলে খবর ছিল। তাই রাজা ইন্দ্রযুগ্ম ওনার প্রধান পুরোহিত বিদ্যাপতির সাহায্য চান। সৈন্য লোকলস্কর সহ বিশ্ববেতাকে নিয়ে মূর্তিটি উদ্বার করেন।

অন্যদিকে জগন্নাথের শবর ভক্ত প্রধান পুরোহিত  বিশ্ব বসু দুঃখে ভেঙ্গে পড়েন। জগন্নাথ দেবও কষ্ট পান। পুনরায় স্বপ্নে রাজাকে নির্দেশ দেন মূর্তিটি ফিরিয়ে দিয়ে আসতে। রাজা ভয় পেয়ে ফিরিয়ে দেন। জগন্নাথ যে জগতের সকলের নাথ!

এরপরই শুরু হল পুরীধামে জগন্নাথের পাকাপোক্ত ভাবে অবস্থানের কাহিনী…………।

জগন্নাথ মূর্তি নীলপাহাড় থেকে উদ্বারের পিছনে আরো কাহিনী  আছে। রাজার পুরোহিত  বিশ্ববেতা জানতেন শবরদের পুরোহিত বিশ্ব বসু জগন্নাথের প্রিয় পাত্র। জগন্নাথ ওনার হাতেই পুজো নেন। তা অতি সহজে ওই পর্বতের গুহা থেকে সে মূর্তি আনা সম্ভব নয়।
তখন রাজার পুরোহিত ছল করে শবর বিশ্ববসুর কন্যাকে বিবাহ করেন। স্ত্রীর সাহায্যে বিদ্যাপতি  জানতে পারেন কোন গুহায়  সে মূর্তিটি আছে। এবং সুযোগ বুঝেই সেই মূর্তি  চুরি করেন। কিন্তু  পরবর্তী কালে জগন্নাথের নির্দেশে এবং ভয় পেয়ে রাজা ইন্দযুগ্ম তা ফেরত দিয়েও আসেন।

কিন্তু  রাজা তাতে হতাশ না হয়ে পুরীতে মন্দির নির্মাণ করার কাজে লিপ্ত হন। এবং জগন্নাথ দেবকে ফিরে আসার আকুতি জানান।

ভগবানের লীলা বোঝা দায়! আবার স্বপ্নাদেশ আসে মন্দির তৈরি হলে দ্বারিক থেকে সমুদ্রে যে নীম কাঠ ভেসে আসবে তা থেকেই তার মূর্তি  তৈরি করতে হবে। মন্দিরের কাজ শুরু  হয়। বিশাল তার কাজ। অনেক শিল্পকলা ছিল তার পরিকল্পনায়। প্রতিটি শিল্পের বা কাজের পিছনে বিরাট সব কাহিনী বা ইতিহাস আছে সে সমস্ত গল্প আলাদা।

সত্য যুগেঃ ভগবান  উত্তর  ভারতের বদ্রীনাথে শ্রী নারায়ণ রূপে আভির্ভূত হন।

দ্বাপর যুগেঃ দ্বারকা ধামে শ্রীদ্বারকানাথ রূপে  প্রকটিত হন।

ত্রেতা যুগেঃ দক্ষিণ ভারতে রামেশ্বরে শ্রীরামচন্দ্র রূপে লীলাবিলাস করেন।

কলিযুগেঃ পুরীধামে ভগবান শ্রীজগন্নাথ বিগ্রহ রূপে প্রকটিত হয়েছেন।

চারধামের মধ্যে জগন্নাথ পুরী ধাম সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত।  পুরীধাম শঙ্খ ক্ষেত্র নামে পরিচিত।
অন্য গুলির মধ্যে  ভুবনেশ্বর চক্র ক্ষেত্র
যাজপুর গদা ক্ষেত্র ও 
কোনারক হচ্ছে পদ্ম ক্ষেত্র
স্কন্দ পুরান অনুসারে পুরীধাম নৃসিংহ ক্ষেত্র নামেও খ্যাত।

এদিকে রাজা ইন্দ্রযুগ্ম মন্দিরের কাজ সমাপ্ত হলে জগন্নাথদেবের শরণাপন্ন হলেন। জগন্নাথ মন্দির দেখে খুশি হন এবং স্বপ্নে আদেশ করেন নতুন মূর্তি বানানোর জন্য। বলেন দ্বারিকা থেকে পুরী  সমুদ্রে ভেসে আসা নীমকাঠ দিয়েই তাঁর মুর্তি বানাতে হবে। একজন মুর্তি নির্মাণের জন্য প্রেরিত হবে।
জগন্নাথ বিশ্বকর্মার উপড় সেই দায়িত্ব দিলেন। এটা রাজাকে জানালেন না।

রাজা কিছু জানলেনও না। বিশ্বকর্মা ছদ্মবেশে তার কাছে এলেন। এবং দায়িত্ব নিলেন কয়েকটি শর্তে।
শর্তাবলী হলো:
১) উনি ওনার মত মূর্তি বানাবেন।
২) মোট ২১ দিন সময় লাগবে।
৩) উনি বন্ধ ঘরে একলা এই কাজ করবেন।
৪) কেউ ওই ঘরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
নিয়ম ভাঙা হলে উনি আর কাজ করবেন না। চলে যাবেন।

রাজা রাজি হলেন। বদ্ধ ঘরে মূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হলো……………

বিশ্বকর্মা দরজা বন্ধ করে দিলেন, নীম কাঠ আর যন্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে। রাজা ইন্দ্রযুগ্ম আর রানী গুন্ডিচা ভাবলেন যে উনি কি করেন দেখাই যাক! মনে সন্দেহ পুষে রাখলেন। রাজার লোকলস্কর সবাই অবাক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমান।  প্রতিদিন ছেনী হাতুড়ির শব্দে সবাই জাগ্রত ছিল। এমনি করে ১৯ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল।

কুড়ি দিনের দিন থেকে আর কোন শব্দ শোনা গেল না। সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। রানী গুন্ডিচা দৌড়ে এলেন। দরজায় কান পাতলেন - না কোন শব্দ নেই। রানীমা ভয় পেয়ে গেলেন। রাজার কাছে খবর গেল। রাজাও ছুটে এলেন। তাই তো! কি ব্যাপার!  ভিতরে কি হলো?
গুন্ডিচা রাজাকে বললেন বৃদ্ধ বোধহয় মারা গেছেন। একনাগাড়ে কাজ আর বাতাসবিহীন ঘরে সম্ভবত উনি দেহ রেখেছেন। আর দেড়ি করে লাভ নেই। দরজা এখনি ভাঙুন - নচেৎ আরো বিপদ আসন্ন। 
রাজাও তাই ভাবলেন। আদেশ করলেন দরজা ভেঙে ফেলার। তাই হল, সৈন্যরা দরজা ভেঙে ফেললো। 
অবাক কান্ড! একি!
ভিতরে যে কেউ নেই। বৃদ্ধ কারিগর উধাও……
আর তিনটি কাঠের অর্ধনির্মিত মূর্তি। জগন্নাথ বলরামের অর্দ্ধ হাত আর শুভদ্রা হাত পা বিহীন।
সকলেই বুঝে গেলেন এই বৃদ্ধ আসলে ভগবানই ছিলেন।  তিন তাঁর কথামত চলে গেছেন।
রাজা বিপদে পড়ে গেলেন। এ আমি কি ভুল করলাম! চিন্তায় পড়ে গেলেন এই মূর্তির শেষ কে করবে?
জগন্নাথের লীলা বোঝা দায়!
মানুষের কি সাধ্য তাকে জানা!

স্বপ্নাদেশ এল রাজার কাছে - আমার এই মূর্তিকেই পুজো করো। মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করো।

তাই হলো। মন্দির জাগ্রত হলো।
কলিযুগে এই মূর্তির বিশেষ মহিমা!
কলির মানুষের জন্য কিছু করার ক্ষমতা নেই - ভগবান নিজেই হাত পা বিহীন - এই বুঝিবা আমাদের জন্য ভগবানের শেষ ব্যাখ্যা -ভবিতব্য!

সেই থেকেই জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রার এই হাত পা বিহীন মুর্তিই পুরীর মন্দিরে অবস্থান করছেন এবং পূজিত হচ্ছেন। ওঁনার মাহাত্ম্য পুরীধামকে এক মহান তীর্থক্ষেত্র রূপে মানুষের হৃদয়ে প্রকটিত করেছেন। 

এরপর অবশ্য জগন্নাথ কল্কি অবতার হয়ে অর্শ্বারোহনে অত্যাচারের অবসানে হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন - সেই দিন বোধহয় হবে আরো ভয়ংকর! সেই মন্দির এখন নির্মানাধীন! 

একটা কথা বলে রাখি এই যে নীম কাঠ দিয়ে  জগন্নাথ মূর্তি তৈরী করা হলো- এখানেও রহস্য আছে। 
সমুদ্র তটে নীম গাছের গুঁড়ি ভেসে এলো। রাজা তার লোকের সাহায্যে ওই গাছ তুলতে গেলে বাঁধা পায়। হাজারো চেষ্টা করেও ওই কাঠ তোলা সম্ভবপর হয়নি।  রাজা বুঝতে পারেন এটা ঠাকুরের লীলা। উনি সঙ্গে সঙ্গে নীলমাধবের পরম ভক্ত জগন্নাথের প্রথম পুজারী শবর বিশ্ব বসুর শরণাপন্ন হন। বিশ্ব বসু এসে সেই কাঠ একাই কাঁধে চাপিয়ে, সমুদ্রের জল থেকে পাড়ে নিয়ে আসেন। এও ভগবানের অন্য এক লীলা। দলিত জাতির প্রতি জগন্নাথের ভালোবাসা।
তারপরের ঘটনা আগেই লিখেছি।

জগন্নাথ দেবের ইচ্ছানুসারে এই মূর্তি ১২ বছর অন্তর বদল করে নতুন মূর্তি তৈরী করা হয়। যে নীম কাঠ থেকে এই মূর্তি তৈরী হয় তা আবার বিশেষ লক্ষনযুক্ত হয়ে থাকে। 

১) তিন মূর্তির জন্য তিন রঙের কাঠ নির্বাচিত করতে হয়।
২) এই কাঠের গাছ শশ্মানে চার মাথার মোড়ে অবস্থিত হতে হবে। অথবা চার পর্বতের মাঝে বেলপাতা সম্বলিত হতে হবে।
৩) গাছের নীচে গুঁড়িতে অতি অবশ্যই সাপের বাসা বা গর্ত থাকতে হবে। অথবা নিদেনপক্ষে পিঁপড়ের বাসা থাকা বাঞ্ছনীয়।
৪) জগন্নাথের গাছের কান্ড চারটি শাখায় বিভক্ত হওয়া জরুরী।

যে মূর্তি নতুনভাবে রূপ নেবে তা পুরোনো মূর্তির স্থলাভিষিক্ত হবে। আর পুরোনো মূর্তি মন্দিরের পাশেই রক্ষিত অন্তিম শয়ান স্থানে মাটিতে কবর দিতে হয়। তবে তার আগে পুরানো মূর্তির প্রান নতুন মূর্তি তে প্রতিস্থাপন করতে হয়। এই কাজ বড় কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে করতে হয়।

আসল কথাটি বলি - শ্রীকৃষ্ণ র মৃত্যু এই পুরীতেই হয়েছিল। ওঁনার দেহ পঞ্চভুতে বিলীন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু হৃদয় পুরীতেই রয়ে গেছিল। তাই জগন্নাথ এখানেই সেই হৃদয়ের উত্তরাধিকারী হন।

এইজন্যই অনেক নিয়ম। অনেক সংস্কার আর কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে পালন করা হয়, নতুন মূর্তি গঠনের সময়।

মূর্তি গুলি তৈরী হয়ে গেলে শুরু হয় পুরোনো মূর্তি থেকে শ্রীকৃষ্ণর হৃদয় নিয়ে নতুন মূর্তিতে প্রতিস্থাপন করার কাজ।

গোটা পুরী শহর সেদিন কার্ফিউ জারি করে ব্ল্যাক আউট করে দেওয়া  হয়। সি আর পি এফ বাহিনী দিয়ে পুরো জনজীবনকে স্তব্ধ করে দেওয়া  হয়।

নির্বাচিত পুরোহিতের চোখেমুখে ফেট্টি বেঁধে গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান একা উনি এই প্রান প্রতিস্থাপনের কাজটি করেন, একেবারে অন্ধের মতোন কোন এক ঈশ্বরের অঙ্গুলি হেলনে।
পুরো ঘটনা ঘটে এক রহস্যময় পরিব্যাপ্তিতে যা সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়।  এর মাপ পরিমাপ হয় না। এখানে বিচার চলে না। তর্ক আসে না। আছে শুধু বিশ্বাস আর আজন্ম ভালোবাসা।
মুনীঋষিদের দেশ এই ভারতবর্ষ। এখানের সব কিছুই এক অনুভূতি কাজ করে যেখানে থাকে অপরিসীম বিশ্বাস আর ভালোবাসার সেতুবন্ধন।

এখন দিন অনেক পাল্টে গেছে  ………
হয়তোবা কলিদেবতার তাই-ই ইচ্ছা ………
       
১২ বছর অন্তর বিগ্রহ পরিবর্তন করার নিয়ম। নতুম বিগ্রহ তৈরী হয়ে গেলে প্রধান পুরোহিত চোখ বুঝে হাতে দস্তানা পড়ে পুরোনো বিগ্রহ থেকে প্রান নিয়ে  নতুন বিগ্রহে প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় তিনি কিছুই দেখতে পারেন না, শুধুমাত্র দস্তানা হাতে অনুভব করেন খরগোশের মত কিছু একটা ধকধকে পদার্থ। এটিকে ব্রাহ্ম পদার্থ বলে।  সেটিকে তিনি নতুন বিগ্রহের হৃদয়ে  দিলেই তা মিলিয়ে যায়।  বড় অদ্ভুত ব্যাপার। 
এই রহস্য আজো গোপনীয়। কেউ জানে না। আর কথিত আছে কেউ জানবার চেষ্টা করলে সে তক্ষনাৎ খন্ডে খন্ডে বিভক্ত হয়ে নিছক মাংসের ঢেলায় পরিণত হয়ে যাবে।

আসলে এটিই শ্রীকৃষ্ণের প্রান। আর এটিকেই ব্রাহ্ম পদার্থ বলে। শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় এ ভাবেই পুরীতে চির প্রকাশিত।

জৈষ্ঠ্য মাসের পূর্ণিমা থেকে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা  পর্যন্ত রথ উৎসব সংক্রান্ত মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

এই সময় মন্দিরের দায়িত্ব পায় সেই দ্বৈতাপতিরাই,  যাদের কে আমরা দলিত শবর জাতি বলে জানি।
এটাই জগন্নাথ দেবের ইচ্ছা।

রাজা ইন্দ্রযুগ্ম প্রথমে এই রথের পথ সোনার ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁড় দিয়ে দেন। পরে সেই পথেই রথ গড়ায়।
এখনও সেই রীতিতে রাজার পরবর্তী বংশধরেরা সেই কাজ করে আসছেন।

আর রানী ছিলেন গুন্ডিচা। জগন্নাথ দেবের পরম ভক্ত হওয়ায় ভগবান তাকেই মাসির আসনে বসান। মা লক্ষ্মীর সঙ্গে ঝগড়া করে এই মাসির কাছে বছরের ৮ দিন থেকে আসেন। ভগবানও স্ত্রীর সঙ্গে লীলাখেলা করেন। ৯ ম দিনে আবার উল্টো পথে উল্টোরথে স্ত্রীর কাছেই ফিরে আসেন।

জৈষ্ঠ্য মাসে স্নান যাত্রায় পূর্ণিমার দিন স্নান করেই জগন্নাথ জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেন। এবং পটল মাথায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। জ্বর থেকে উঠেই লক্ষ্মীর সঙ্গে ঝামেলা বাঁধান এবং বাইরে যাবার অছিলা খোঁজেন।

আসলে সমগ্র জাতির লোক তাকে দেখতে চায়, তাকে ছুঁতে চায় কিন্তু  তাতে তো বাঁধা অনেক। নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র হিন্দুদেরই মন্দিরে প্রবেশাধিকার রয়েছে।  বছরের মাত্র এই দুদিন এই সোজারথ আর উল্টোরথ এই দিনেই  সব জাতির সব লোক তার দেখা পায় তার রথের দঁড়ি ছুঁতে পারে।

অন্য প্রান্তে গুন্ডিচা মন্দিরেও ৮ দিন ধরে চলে এই উৎসব।

আর এই সুযোগে পুরীর মূল মন্দিরে রক্ষনাবেক্ষনের কাজ সারা হয়। সারাবছরের ব্যবহৃত রান্নাঘর পূণর্নির্মাণ করা হয়।

জগন্নাথ যে রেগে গিয়ে, যাওয়ার আগে মা লক্ষ্মীর রান্নাঘর ভেঙ দিয়ে যায়!

আজ আরো একটি পৌরাণিক কাহিনী তুলে ধরবো। জগন্নাথের রূপ আর জন্মবৃত্তান্ত আমি আগেই লিখেছি। কিন্তু এব্যাপারেও দ্বিমত আছে। আজ সে কথাই আলোচনা করবো। 

হিন্দুদের যত দেবদেবী আছেন জগন্নাথ তাদের মধ্যে পড়েন না। জগন্নাথ অসাম্প্রদায়িক দেবতা। প্রচলিত কোন সম্প্রদায়ের দেবতাদের মধ্যে উনি পড়েন না। বৈষ্ণব, শৈব,শাক্ত স্মার্ত - এই চার ধর্মাবলম্বীদের কোনোটার মধ্যেই উনি নেই। অথচ সকলেই তাঁর পুজো করেন। বৌদ্ধ, জৈন এরাও পুজো করেন। ওরা অনাকে ভগবান বৌদ্ধ ভেবে পুজো করেন। তবে ওনেকেই ওনাকে বিষ্ণুর নবম অবতার বলে চিহ্নিত করেন আর বুদ্ধদেবের সঙ্গে এক করে দেখেন।

গল্পটি এইরকম :

বৃন্দাবনে গোপীরা কৃষ্ণ কে খুবই ভালোবাসতো। সব সময়েই তারা কৃষ্ণর গুনগান করতো। কৃষ্ণ এসব খুব উপভোগ করতো। 
এইজন্য একদিন তারা তাদের বোন সুভদ্রা কে গোপীদের উপর নজর রাখার দায়িত্ব দেয় -যে তারা কি বলছে সব শুনবে আর পরে তা জানাবে।
সুভদ্রা গাছের আড়ালে থেকে সব শুনছিল। আর বড়ই রোমাঞ্চকর সেইসব কথাবার্তা আলোচনা চলছিল।
গোপীরা এসব কিছুই জানতো না - তার নিজেদের মত করে হেসে লুটিয়ে পড়ে কৃষ্ণকে নিয়ে নানান মেয়েলী আলোচনা চালাচ্ছিল।
অন্য দিকে ওই পথ ধরে কৃষ্ণ আর বলরাম আসছিল, ওরাও এই সব ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা আর হাসির রোল শুনে চমকে ওঠে এবং লজ্জায় ওদের হাত পা গুটিয়ে যায় আর চোখ বড় বড় হয়ে গোল গোল হয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ে। অন্য দিকে শুভদ্রারও হাত পা পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে যায়। এই যে অবস্থা ওঁনাদের তিনজনের হয় -এটিই 
জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রা র তিন রূপ এই তিনটি রূপেই ওরা কলিযুগে অবতারের আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।

ভগবানের লীলা বোঝা ভার! যেদিক দিয়েই যান না কেন -মূল বিষয় সেই একটাই - বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!

সুতরাং আমরা সেই বিশ্বাস আর ভালোবাসারই দাস !

মন্দিরের প্রতিটি শিল্পকলা নিপূণভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের নানান পৌরাণিক কাহিনীর অবতারণা করে। আমরা খালি চোখে তার মর্ম না বুঝে অশ্লীলতার অর্থ খুঁজে লজ্জা পাই। আসলে এর গভীরতা আমাদের হৃদয় তখনই ছুঁয়ে যাবে যদি একটু ভারতবর্ষের আদি অনন্ত ইতিহাস নিয়ে জ্ঞানার্জনকে কাজে লাগাই।

মন্দিরে বহু দেবদেবীর পৃথক পৃথক মন্দির আছে।তাদেরও নিত্য পুজো হয়। মূল মন্দিরটি অনেক উঁচুতে অবস্থিত। মন্দিরের বাইরে যে লম্বাকৃতি গম্বুজের মাথায় জগন্নাথদেবের বাহন গরুড় পক্ষীকে আমরা দেখতে পাই - উনি যে উচ্চতায় হাত জোড় করে অবস্থান করেন - জগন্নাথ ঠিক সেই সমান্তরাল উচ্চতায় বসে থাকেন।

মন্দিরের উচ্চতা ২১৪ ফুট।  আশ্চর্যের বিষয় সূর্যের আলোয় কিন্ত মন্দিরের ছায়া ভুপুতিত হয় না।
মন্দিরের চুড়ায় সুদর্শন চক্র থাকে তা মন্দিরের সমস্ত দিক থেকেই সামনের দিকই পরিলক্ষিত হয়। 
মন্দিরের চূড়া দিয়ে কোন পক্ষী আকাশ ভ্রমণ করে না। বিমান চলচলের উপড় বিধিনিষেধ বলবৎ করাই আছে।

এর মস্তকে ধ্বজা লাগানো থাকে। যার অনেক নিয়মাবলী আছে। প্রতিদিন সকালে ধ্বজা লাগাতে হয় এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগে খুলে নিতে হয় । এর জন্য পারদর্শী ধ্বজাধারীও আছে --এটা বেশ কঠিন কাজ! কিন্তু জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদে এই কাজ যেন সহজেই সমাপ্ত হয়। 
নিয়ম আছে -- এই কাজ প্রতিদিন ঠিকমতো না হলে মন্দির ১৮ বছরের জন্য বন্ধ  করে দেওয়া  হবে -এইরকম স্বপ্নাদেশ দেওয়া আছে।

মন্দিরের চারিধারে চারটি ফটক আছে। সিঁড়ি  বেয়ে বেয়ে মুল মন্দিরের গর্ভগৃহে চলে যাওয়া যায়। গর্ভগৃহে বৈদ্যুতিন আলো জ্বালাবার অনুমতি  নেই। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে থেকে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। গর্ভগৃহে উচ্চ বেদীতে রত্ন সিংহাসনে জগন্নাথ বলরাম আর সুভদ্রা তিনজন উপবিষ্ট থাকেন। আমাদের বাঁয়ে বলরাম মাঝে সুভদ্রা আর ডানে জগন্নাথ বসেন। 

সুভদ্রা সাগরের গর্জনে ভয় পায় তাই তাঁকে মাঝে রেখে দেন দুই ভাই। পুরীতে সমুদ্রের গর্জন অনেক স্থানেই শ্রবণ‌যোগ্য কিন্তু মন্দির প্রাঙ্গণে তা থেমে যায় - সুভদ্রা ভয় পায় -তাই জগন্নাথের এই ব্যবস্থা!

পুরীর সমূদ্র ধারে পুরানো আমলের কাঠের চুল্লী এখনও বিদ্যমান। মৃতদেহ সৎকার এইস্থানে হলে তার পরিণতি আত্মার সুখের হয়। শহরে তার পোড়া গন্ধ প্রায়শই বিরাজমান কিন্তু মন্দিরের মধ্যে তা কোনসময়ে পাওয়া যায় না।

কথিত আছে এই গর্ভগৃহে মূল বেদীর চারদিক প্রদক্ষিণ করলে দুনিয়ার সব ধাম ঘোরার ফল প্রাপ্তি হয়।

মন্দিরের মধ্যেই প্রসাদ  বিলির বিশেষ ব্যবস্থা আছে। এখানে ভোগ ক্রয়বিক্রয় হয়। বলরামের ভোগ হয় খুব দামী তাই এই প্রসাদ মহামূল্যবান, তারপর সুভদ্রার ভোগ আর সবচেয়ে কমদামী ভোগ গ্রহণ করেন জগন্নাথ।  উনি জগতের নাথ তাই উনি সবচেয়ে সাধারণ ভোগ গ্রহন করেন।
এই বাজারের নাম. " আনন্দ বাজার" ।

মন্দিরে বহু প্রজাতির পাখী সহ হনুমানের লাফালাফি এক বিশেষ প্রযোজনা যেন।

হিন্দুজাতি  ছাড়া অন্য ভিন্ন কোন জাতির ভিতরে প্রবেশাধিকার নেই তাই মন্দিরের মূল ফটকে সকলের দৃশ্যমান হওয়ার জন্য কৃপাচার্য হয়ে জগন্নাথদেব  ডানহাতে উপবিষ্ট থাকেন যাতে সকলেই মন্দিরের বাইরে থেকে তাঁকে প্রনাম জানাতে পারেন।

ভগবানের লীলা বোঝা ভার! যেদিক দিয়েই যান না কেন -মূল বিষয় সেই একটাই - বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!

ভগবান জগন্নাথ আর মা অন্নপূর্ণার রান্নাঘর দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর আশ্চর্যের রান্নাঘর।
এখানে ৭৫২ টি চুল্লীতে রান্না হয়। ৯ টি ভাগে রান্নাঘর বিভক্ত।  ২ টি ভাগ প্রায়  ২৫০০ বর্গফুট চওড়া আর ৪ ফুট লম্বা। আর ৭ টি কিছুটা ছোট। 
কাঠের আগুন একেবারে নীচে জ্বালানো হয় আর উপড়ে ৯ টি মাটির পাত্রে ওই তাপেই রান্না হয়। এ এক বড় আশ্চর্যের ব্যাপার স্যাপার! আর রান্নাঘরের আলো কাপড়ের সলতের বাতির ঝোলানো আগুন থেকেই আলোকিত হয়। বিদ্যুতের আলো ব্যবহৃত হয় না। 

মোট এক হাজার জন রাঁধুনি রোজ কাজ করে। ৫০০ জন সরাস‌রি রান্নার কাজে যুক্ত থাকে আর বাকী ৫০০ জন সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করে। ১২ বছরের পর থেকেই এদের ট্রেনিং শুরু  হয়।  এরা সারাজীবন এই ঠাকুরের রান্নার কাজই করে।

সব কাজ হয় মাটির পাত্রে। এই পাত্রগুলি একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া  হয়। কয়েকজন শুধুমাত্র এই মাটির পাত্র তৈরী করে কয়েকজন তা রান্নাঘরে আনে কয়েকজন তা ধুয়ে জল ভরে সরবরাহ করে। 

রান্নাঘরের মধ্যে  দিয়ে গঙ্গা আর সরস্বতী নদীর জল বয়ে চলে। আসলে এটি রূপক।  পাইপ লাইনের মধ্যে দিয়ে ভিতরে জল প্রতিনিয়তই সরবরাহের কাজ হতে থাকে।

জগন্নাথ স্থানীয় সব্জি ডাল এইসব ভোগে তৃপ্ত হন।
বলরাম সুভদ্রা একটিমাত্র আলাদা খাবার গ্রহন করেন।

প্রতিদিন ভোগের খরচ আনুমানিক ২ লাখ টাকা  লাগে।

ভোগের পর প্রসাদ পান উপবিষ্ট ১০,০০০ জন আর সাধারণ দর্শক ৫,০০০ জন।

ছাপান্নভোগ হল একটি রাজদত্ত অনুষ্ঠান। যেখানে একাধিক মিস্টান্ন দ্রব্য এর ভোগ ছাড়াও ভিন্ন ধরনের ভোগ যা তালিকা কেও অতিক্রম করে যায়।  জগন্নাথ দেবের ছাপান্ন ভোগের তালিকাঃ (মিষ্টান্ন ভোগ) ১) জগন্নাথবল্লভ,২) কণিকা,৩) নুনফেনী,৪) ধনুশ্বরন,৫) ফেনা,৬) খড়ি কামড়া,৭) বড়পুরি,৮) বড়নাড়ী,৯) সান নাড়ী,১০) চন্দ্রকান্তি,১১)হংসকেলি,১২) কাকরা,১৩) সান ঝিলি,১৪) পনশুয়া,১৫) বড়ঝিলি,১৬) বড়া,১৭) আরিষা,১৮) মরিচলাড্ডু,১৯) পাগ আরিষা,২০) কাকাতুয়া ঝিনি,২১) তিপুরী,২২) খিরিষা,২৩) অরখফুল,২৪) গজা,২৫) মেনঢাশিঙ্গিয়া,২৬) সরকুম্পা,২৭) চউতাপুরি,২৮) সরুচ কুলি,২৯) নিমকি,৩০) মগজনাড়ু,৩১) খজা,৩২) ডালিম্ব,৩৩) পারিজাতক,৩৪) সরমন্ডা,৩৫) সরভাজা,৩৬) খোয়ামণ্ডা,৩৭) মাণ্ডুয়া,৩৮) অমৃত রসাবলী,৩৯) অমালু, ৪০) বল্লভকোরা,৪১) চড়েইনদা,৪২) সুয়ারি,৪৩) বড় খিরিয়া,৪৪) ছানা মান্ডুয়া, ৪৫) নারিকেল লাড্ডু,৪৬) কড়ম্বা,৪৭)সাতপুরি,৪৮) মাথপুলি,৪৯) ছানাপিঠা,৫০) হংস বল্লভ,৫১) সেবতি ঝিলি,৫২) সর,৫৩) এন্ডুরী,৫৪) সরপাপুড়ি, ৫৫) নড়িয়াখুদি,৫৬) খণ্ড মণ্ডা,৫৭) মহাদেঈ,৫৮) বুঁদিয়াখিরি,৫৯) পিঠাপুলি, ৬০) শ্রীহস্তকোরা,৬১) জেনামণি,৬২) গুড়াখিরিয়া,৬৩) মোহনভোগ,৬৪) সরকাকরা,৬৫) নুনখুরমা,৬৬) কঁলপুলি,৬৭) খইরচুর,৬৮) লক্ষ্মীবিলাস,৬৯) অটকালি, ৭০) বলিবামন,৭১) ছানাচটকা,৭২) চুলিয়া চুপড়া,৭৩) শেউ,৭৪) চুঁচিপত্র,৭৫) চিউতপিঠা,৭৬) পোড়া পিঠা,৭৭) মাখন,৭৮) অতরছমন্ডা,৭৯) সরপণা,৮০) গঁইঠা পিঠা,৮১

উল্টোরথে মাসি গুন্ডিচা দেবীর বাড়ি থেকে … 
জগতের নাথ শ্রী বিষ্ণু জগন্নাথ রূপে ~ 
মহাদেব বলরামের বেশে ~শক্তি রূপী শুভ্রদা একসাথে বাড়ছে ফেরার জন্য তৈরি হন।
জগন্নাথ আর মা লক্ষ্মীর ঝগড়ার খেসারতে যে গৃহত্যাগ করেছিলেন তারা বাড়ি ফিরে চলেছেন……

জগন্নাথ আর লক্ষ্মী এক অভিন্ন রূপ! নারায়ণই এই কলিযুগে লীলা করছেন। সংসার সমূদ্রের ঢেউয়ের ওঠানামা যেন তাদের জীবন-পরিক্রমা।
সবটাই এক রূপকধর্মী অবতারণা।

ইন্দ্রযুগ্মর ধর্মপ্রাণা স্ত্রী গুন্ডিচা দেবীকে মাসি ডেকেছিলেন জগন্নাথ। লক্ষ্মীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে  " নিকুচি করেছে তোর সংসারে "  এই কথা বলে রেগে রান্নাঘর ভেঙ্গে দিয়ে, মাসির আদর খেতে চলে গেছিলেন।  ক্রোধ যে বড় ভয়ানক!  বলরাম আর সুভদ্রা যে জগন্নাথের দলে! ওঁনারও ওঁর সাথে গাঁটছড়া বাঁধলেন। পরিণতি রথযাত্রা।  এক যাত্রায় বহু ফল!-- সকলের সঙ্গে  মিশে যাওয়া।  আর লক্ষ্মী মাকে টাইট দেওয়ার এক কৌশল! 
কিন্তু তাই কি হয়? 
সংসারে গিন্নিকে কি টাইট দেওয়া যায়?
যার হাতে সব জগত সংসারের কলকাটির চাবি!

কিছুই হলো না। মাসির মায়া কেটে গেল। গিন্নিকেই চাই। না হলে যে জগৎ অন্ধকার!

আর মালকড়ি?
সেতো সবই তেনার হেফাজতে --
মাসির ভান্ডার শূন্য করে দিতে তাঁর একমিনিট সময়ও যে লাগে না!
লক্ষ্মী ও কম যান না। বলে -- যা বাইরে একটু ঘুরে  আয় - তেল একটু কমুক - তারপর ঠিক আমার পিছনেই ঘুরঘুর করবি -- তখন আমার কদর করবি -- না হলে অবহেলার শিকার হয়ে যাবো যে ?

যদিও সবটাই প্রতীক!
তবুও মহিলারাই এর উত্তর ভালোই জানেন!

উল্টোরথ ফিরে আসছে। জগন্নাথ ফিরে আসছে। মা লক্ষ্মী,  মা অন্নপূর্ণা আনন্দে আত্মহারা। নতুন করে রান্নাঘর সাজিয়ে তুলেছেন -- স্বামীকে যে অনেকদিন পরে নিজের হাতে আগের মতোন করে ৫৬ ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন, আর তৃপ্ত হবেন। স্বামী যে তাঁর গুরুর গুরু!

জগন্নাথ আর অন্নপূর্ণা'র মিলন জগতের মঙ্গলের জন্যই একটি শিক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়।

আমি নানান বই নানান পরিসংখ্যান ঘেঁটে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি আমার লেখক জীবনের এক পুস্পার্ঘ সাজাতে যা জগন্নাথদেবকে অর্পণ করে আনন্দ দিতে চাই সকলকে। 

সচরাচর প্রথাগত পুজোয় উনি সন্তুষ্ট নন। মানুষের কর্মই তার পুজো। তাই চৈতন্যদেব থেকে আরো অনেক মুনী ঋষি তাঁকে তাদের বিভোর প্রেমে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। কতশত কবি লেখক গায়ক গীতিকার  জগন্নাথদেবকে নিয়ে তাদের কলম ধরে ছিলেন। লিখে গেছেন তাঁদের অমর কাব্য, গীত, রচনা। সেইসব অমর সৃষ্টি তাঁদের পুস্পাঞ্জলি তাঁদের পুজো এই মহাশক্তিধরের চরণেই নিবেদিত। আমার এই লেখাই আজ তার পুজো। সোজারথ থেকে উল্টোরথ এই পাক্ষিকে আমার এই লেখা  ভগবানের উদ্দেশ্যে আর তার প্রসাদ আপনারা ভগবান ভক্তবন্ধুরাও আস্বাদন করবেন এই আশা রাখি। কারণ ভক্তই ভগবান!

আপনারা কি বলেন ? পরিশেষে এই একটি প্রশ্ন রেখে গেলাম!

শুভ উল্টোরথ যাত্রা ~
সমাপ্ত ।  🙏🙏🙏
বিঃদ্রঃ  আমার লিখিত পুস্তক পুরীধামে প্রদানকৃত।
#অমাদীপ_প্রদীপদে

শব্দ : ৩১৫৬

Labels:

গল্প

গল্পঃ
'আমার আলেয়া'
প্রথম পর্বঃ
~~~~~~~~~প্রদীপ দে

ট্রেনটা ছেড়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণের একটানা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো চারিধারে। তারপর আবার নিস্তব্ধতা গ্রাস করলো স্টেশন চত্বরে।        আমি ছাড়া আর দুজন নেমেছিল তারা বেড়িয়ে গেছে। আমি এখন একা এই পাহাড়ি স্টেশনে। সিমেন্টের চেয়ারে বসে পড়লাম। ঠান্ডা আছে তবে সহ্য করতে পারছি কারন শরীরে যথেষ্ট পরিমান শীতবস্ত্র ছিল। কেন যে এখানে নামলাম জানিনা। ট্রেনে এক ব্যক্তির মুখে শুনে এখানকার ইতিহাস জানার একটা তাগিদ অনুভব করলাম,  যা শেষ পর্যন্ত আমাকে এখানে টেনে আনলো। কিন্তু এখন  আমি এই পাহাড়ি এলাকায় কোথায় থাকার ঘর খুঁজতে যাব? অন্ধকারে কিছু দেখাও যাচ্ছে না ভাল করে। একটা সিগারেট ধরালাম মাথাটাকে কাজ করানোর জন্য। চারবার টানার পর বেশ শরীর মাথা চাঙ্গা মনে হল।
কে যেন পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডেকে উঠলো। চমকিয়ে গেলাম - এক পরিচিত মহিলার কন্ঠস্বর! মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম পিছনে দাঁড়িয়ে আমার ছোটবেলার বন্ধু আলেয়া। একসংগে পড়াশুনা,বড় হয়ে ওঠা,তারপরে বিয়ে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি। ব্যাস ছাড়াছাড়ি।
আমি ওকে অবাক চোখে দেখছি।
আলেয়াই সহজ করে দিলো - আরে তুই এখানে?
আমি হতবুদ্ধি।
ওই হেসে ফেললো - আরে আমি আলেয়া! 
এখানেই তো আমার শ্বশুরবাড়ি।

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
দ্বিতীয় পর্বঃ
~~~~~~~© প্রদীপ দে।
''''''''''''''""""""""""""""""""""""""""""'""""'"
আমি ভাবতেই পারছি না এই পাহাড়ি জনমানব শুন্য স্টেশনে আলেয়ার দেখা পাবো। আমি ওর মুখের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে ওকেই দেখছি। ও যেন খুব ফর্সা হয়ে গেছে।কেমন সাদাটে লাগছে। ও তো ছিল শ্যামবর্ন। পাহাড়ি এলাকায় এত পরিস্কার হয়ে গেছে?  আর চোখ দুটোও যেন কেমন লাগছে। অথচ মুখে হাসি সেই আগের মতোই। আমি এইসবই ভাবছি। আর ও হেসেই চলেছে। হো - হো -হো। মিষ্টি সুরে পাহাড়ে হাসি ধাক্কা খেয়ে আবার বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

-- কি তুই ভাবছিস আমি এখানে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম?  আরে নারে না। আমার কর্তা কে ছাড়তে এসেছিলাম। ও তো তোর ট্রেনেই জলন্ধর গেলো। ফিরছি, দেখি তুই বসে। তুই যেমন অবাক হয়েছিস ,আমি ও তেমনই। 

আমি এবার বুঝলাম - ও তাই বল।তোরা এখানে থাকিস?

--  হ্যাঁ রে। আমার শ্বশুর এখানকার পুরোনো আমলের জমিদার।কর্তা হলেন সৈন্য বাহিনীর একজন মেজর। 

-- ওরে বাব্বা!  - যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

-- তা তুই এখানে কি ভাবে? আগে তাই বল?

-- আরে যাচ্ছিলাম জলন্ধরেই। হঠাৎ ট্রেনে এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। লেখালিখি করি জানতে পেরে আমাকে এখানে একবার নামতে বললে। এখানে নাকি পুরানো আমলের অনেক ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আমাকে অনুরোধই করলো একবার যদি ঘুরে যাই।তাহলে নাকি অনেকেরই সুবিধা হবে। অনেক খবর নাকি অপ্রকাশিত হয়ে রয়ে গেছে।

দেখলাম ফাজিল আলেয়া মুচকি মুচকি  হাসছে।
-- তুই নিজেকে কি ভাবিস?  একজন বড় লেখক না কি?

আমি বেশ লজ্জা পেলাম, যদিও ও আমার বন্ধু। কিন্তু কথাতো ঠিকই বলেছে।

আলেয়া আক্ষেপ করলো -- তুই যদি এতই বুঝতিস তাহলে কি আর এতসব ঘটতো?

বুঝলাম ও আমার অসহয়াতার কথাই বলছে।সত্যি  আমি ওকে সেদিন গ্রহন না করে হয়তো আমি ওকে অমর্যাদা করেছিলাম এটা ঠিকই, কিন্তু  আমার তো কোনো ক্ষমতাই ছিল না। ওই দিন না করেছিলাম বলেই না, আজ ও এই জমিদার ঘরের এক বৌমণি।

ও তাও হাসছে। -- তা বলি ওই বয়স্ক লোকটিকে দেখতে কেমন?

-- একেবারে সুন্দর শুভ্রকেশী এক সদাশয় ব্যক্তি।

-- নে নে খুব হয়েছে। এবার ওঠ। চল আমার সঙ্গে।

আমার না বলার উপায় নেই। ও ছাড়বেও না তা আমি ভালই জানি। কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লাম।  -- তা যাব কি ভাবে?

-- আলেয়া কাপড় ঘুছিয়ে চোখ নাচালো -- গাড়ি আছে।

আমি কি বোকা?  কিসব বলছি?

স্টেশনের বাইরে আসতেই সামনে ঝকঝকে আম্বাসাডার সাদা রঙ্গের গাড়িতে চোখ গেল।
ড্রাইভার খুঁজছি। আবার বোকা বনে গেলাম।

আলেয়া ব্যাপারটা বুঝে হেসে লুটোপুটি  খেল। খুব ভাল লাগলো ওকে।

-- আরে আমিই ড্রাইভ করি। তুই না একটা পুরানো গরুই রয়েছিস!

লজ্জায় কথা বাড়ালাম না গাড়িতে উঠে বসলাম। আলেয়া গাড়ি স্ট্রাট দিয়ে দিল।একটা শীতল বাতাস ছুটে এলো।গাড়ি প্রচন্ড জোরে চালাচ্ছিল ও। আমি এই পাহাড়ি এলাকায় নির্জন স্থান এক ভীতু মানুষ আলেয়ার সাহসে সাহসী হলাম।

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া ~~~
পর্বঃ তৃতীয় 
~~~~~~প্রদীপ দে।
---------------------------
মাঝরাত। অন্ধকার। নির্জন। কালোমেঘে আকাশ যেন মুড়ে রয়েছে। একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ।
আলেয়া গাড়ি নিয়ে যেখান থামলো, সেখান জমাট বাঁধা অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। চোখ কচলে গাড়ি থেলে নামলাম আলেয়ার সঙ্গে। ভাল করে তাকিয়ে অবাক বিষ্ময়ে দেখলাম আমি এক বিরাট রাজপ্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আলেয়া বুঝতে পেরে সেই রাজহাসি হাসলো -- কি দেখছিস?

-- বিরাট ব্যাপার! ভাবতে অবাক লাগছে। তারমানে তুই এই রাজপ্রাসাদের মালকিন?  কিন্তু  আলো নেই কেন?

ঝকঝকে দাঁত দেখা গেল আলেয়ার -- কে বললে আলো নেই? তুই পাহাড়ি অঞ্চলের খবরাখবর রাখিস না তাই জানিস না। পাহাড়ি অঞ্চলে অধিকাংশ সময়ে বিদ্যুৎ থাকে না।

আমি এখন পুরোদম পেয়ে গেছি। আর নিজেকে বোকা ভাবতে পারছি না। লড়ে গেলাম -- দ্যাখ আলেয়া তুই সব ব্যাপারে মাতব্বরি করবি না।তুই বড়লোকের বউ বলে কি সব জেনে গেছিস?  কে বলেছে সব পাহাড়ি অঞ্চলে সবসময়  আলো থাকে না?

আমি বড় লোহার গেটে দাঁড়িয়ে। আলেয়া আমার হাত ধরে এক হ্যাচকা টান মারলো এমন ভাবে যে আমি ওর বুকে গিয়ে পড়লাম। অনেকদিন বাদ ওর শরীরের স্বাদ যেন আমায় রোমাঞ্চিত করলো। খুব দামী মনে হলো নিজেকে আলেয়ার সান্নিধ্যে এই বিশাল রাজবাড়ির এক অতিথি হয়ে।

আলেয়া আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে এলো -- অনেক জেনে গেছিস না?  আমি বলছি এখানে বিদ্যুৎ প্রায়ই থাকে না আর তুই চালাকি মারছিস? চল ভিতরে চল।

আমি খুশি হলাম -- তাই বল।

ওর হাত ধরে আমি অন্ধকারেও হাঁটতে পারি। আগে কত হেঁটেছি। হঠাৎ যে কি সব হলো। একটা ভালো চাকরি যদি জোতাতে পারতাম তাহলে আলেয়াকে হারাতে হত না। তা যাকগে। ভগবান যা করে মঙ্গলের জন্যই করে। না হলে কি এইদিনটা কে এইরকম ভাবে পেতাম।

বাগান পেড়িয়ে, উঠোন ডিঙিয়ে, যখন রাজ মহলে প্রবেশ করলাম ,তখন আলেয়া একটা ঘরে নিয়ে গেলো। দেখলাম ঘরটায় বেশ আলো হয়ে রয়েছে।
আমি অবাক হয়ে দেখছি।

আলেয়া মুখ খুললো -- এটা ইমার্জেন্সি আলো।

আমি কিন্তু আলোর বাতি খুঁজে পেলাম না। চকিতে আলেয়া আমাকে ঠেলে বাথরুমে চালান করে দিল। ও নিজেও অন্য বাথরুমে সেঁধোলো।

বিরিয়ানি সহ বেশ কয়েকটি ভাল ভাল পদ ও ড্রাইনিং টেবিলে সাজালো।আমাকে ডাকলো -- আয় আগে দুজনে খাওয়া টা সেরে ফেলি তারপর কথা হবে।

আমি সব কিছু খুঁজি। কাউকে দেখতে না পেয়ে মনটা উশখুশ করছিল। আলেয়া ঠিক বুঝে নিল।ও আমার সব  বোঝে -- দেখলি তো স্বামী বাইরে চলে গেল। শ্বশুর কাজে বাইরে। কাজের সব লোককে রাতে বাড়ি পাঠিয়ে দিই।

আমি বুঝলাম। হাসলাম। ও মুখ ভেংচি কাটলো।
চোখ দিয়ে ইশারা করলো যার মানে, ও যদি অবিবাহিত হত এবং  আমার প্রেমিকা এখনও থাকতো ,আমি সে সুযোগ নিতাম।

খাওয়া দাওয়া সেরে ও কয়েকটা ঘর আমাকে ঘুরে দেখালো। ইমার্জেন্সি আলোয়। শ্বশুরের ঘরে নিয়ে গেল না। জানালা দিয়ে আমি ভিতরটা দেখার চেষ্টা  করলাম। একপলকে ঘরের টাঙানো বিশাল ছবিটা আমার নজরে এলো। কি রকম যেন মনে হল আমি জানালা দিয়ে আবার দেখবার চেষ্টা করলাম --  ট্রেনে এই ভদ্রলোক ই তো আমায় এখানে নামতে বলেছিল। আমি  ভাল করে দেখছি।

আলেয়া ওর সরু সরু আঙুল গুলো আমার চোখের সামনে নাড়ালো -- কি দেখছিস উনি আমার শ্বশুর মশাই।

-- আমি তো তাই দেখছি।উনিই তো আমার ট্রেনে ছিলেন। ওনার কথামতই আমি এই পাহাড়ি স্টেশনে ইতিহাস জানতে নেমে পড়ি।

-- তাই নাকি?  ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। বাঃ বেশ। বেশ! তাহলে তো কাল ওনার সংগে তোর দেখা হয়ে যাবে।  

আলেয়া হাসছে। আমি ওর খুব কাছে। ইচ্ছা হচ্ছে ওকে ভাল করে দেখি। কথা বলি। পারলে পুরানো আদর ফিরিয়ে দিই ---।

শেষ রাত। আলেয়া আমায় একটা ঘরে বিশ্রাম। নিতে বললো -- তুই এই ঘরে শো। আমি পাশের ঘরে আছি। কাল সব ঘুরে দেখাবো।রাতে দরকার হলে ডাকিস।

আমি মুচকি হাসলাম -- আর দরকার! শুভ রাত্রি।

একটু তন্দ্রা এসেছে।এমন সময়ে দরজা খোলার আওয়াজ হলো। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি আলেয়া দাঁড়িয়ে।  

-- কিরে তুই ঘুমাচ্ছিস? আমি গুমোতে পারছি না আর তুই দিব্যি ঘুমাচ্ছিস? এতদিন পর দেখা?

-- কি করবো বল তুই তো আর এখন আমার নয়, অন্যের।

ও এক ঝটকায় আমাকে জাপটে ধরলো,বিছানায় উঠে -- কে বলেছে আমি তোর নয়?  আমি তোরই!
মন অন্য কাউকে দেওয়া যায়? মেয়েরা বারাবার প্রেম করতে পারে না,একবারই করে।

আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না।অসহায় ভাবে আলেয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলাম। অনেকদিনের বাকি থাকা ভালোবাসা আদরে আদরে ভরিয়ে দিলাম। যৌবনে এরকম বহুবার ওকে ভালোবেসেছি। আজ আবার নতুন করে বাঁধ ভাঙা ঢেউয়ে ওকে ভাসিয়ে দিলাম। দেহসুখে আমারা দুজনে তখন দুই বিহংগ এক হয়ে গেছি। আলেয়া যে এখনো আমায় ভোলেনি এবং  ওর চাওয়া পাওয়া অনেক বাকি তাই বোঝাতে লাগলো। আমি এই মূহুর্তে শুধুই আমার পুরানো অক্ষমতার গ্লানি থেকে বাঁচতে, ওকে উজাড় করে ভালোবাসা দিতে থাকলাম।
---------------------------

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
চতুর্থ পর্বঃ
~~~ প্রদীপ দে।

আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না।অসহায় ভাবে আলেয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলাম। অনেকদিনের বাকি থাকা ভালোবাসা আদরে আদরে ভরিয়ে দিলাম। যৌবনে এরকম বহুবার ওকে ভালোবেসেছি। আজ আবার নতুন করে বাঁধ ভাঙা ঢেউয়ে ওকে ভাসিয়ে দিলাম। দেহসুখে আমারা দুজনে তখন দুই বিহংগ এক হয়ে গেছি। আলেয়া যে এখনো আমায় ভোলেনি এবং  ওর চাওয়া পাওয়া অনেক বাকি তাই বোঝাতে লাগলো। আমি এই মূহুর্তে শুধুই আমার পুরানো অক্ষমতার গ্লানি থেকে বাঁচতে, ওকে উজাড় করে ভালোবাসা দিতে থাকলাম।

মধুর এক তৃপ্তি নিয়ে চোখ বুঁজে আছি, হঠাৎই গুলির আওয়াজে রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠলো।
আমি সবে বোঝবার চেষ্টা করছি, তখন আলেয়া আমাকে জড়িয়ে ধরলো -- তুই আমাকে তোর বুকে লুকিয়ে রাখ -- না হলে ওরা আমায় মেরেই ফেলবে।

আমি হতবুদ্ধি। -- সেটা আবার কি?

ততক্ষণে পুরো রাজপ্রাসাদ জুড়ে বোমা গুলির আওয়াজে ভরে গেছে। তীব্র আর্তনাদ শুনতে পেলাম। গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়ার মতই সে আওয়াজ। অনেক কালো কালো ছায়া শরীরের
দৌড়াদৌড়ি দেখতে পেলাম। আমি এমনিতেই ভীতু। আরো ভয় পেয়ে শক্ত হয়ে গেলাম। আলেয়াকে সর্বশক্তি দিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা চালালাম।আমার ঘরের মধ্যেও ওদের হানা শুরু হলো। কি করবো বুঝতে পারলাম না। কথা বলতেও পারছি না। আলেয়ার শরীর যেন ভয়ে শক্ত হয়ে গেছে  --। মিনিট দুয়েকের পরেই। দেখলাম আলেয়া আমার বুকে নেই। আমি চমকে উঠে বসে পড়লাম। সারাঘরে ওকে খুঁজতে লাগলাম অন্ধকারে ও। না ও কোথাও নেই। কোথায় গেল আলেয়া। ততক্ষণে আওয়াজ অনেকটাই কমে গেছে। শুধু কারা যেন চুপিচুপি  কিছু কাজে ব্যস্ত। সময় নষ্ট না করে সাহস করে দরজা খুলে উঁকি মারতেই চক্ষু চড়কগাছ! দেখি উঠোনে আলেয়াকে দুজনে ধরে রেখেছে, অন্যজন রিভলভার তাক করে।

আলেয়া চিৎকার করে চলেছে -- আমাকে মেরো না তোমার পায়ে পড়ি। আমায় ছেড়ে দাও।প্লীজ আমায় দয়া করো।

এক আগুন্তককে বলতে শুনলাম - ক্ষমা আমি তোকে করতে পারবো না। তুই একটা পাপী। কুলটা। মিথ্যাবাদী।

-- তুমি কি বলছো ? তুমি যে আমার স্বামী। তুমি আমাকে কেন অবিশ্বাস করো? আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমারই। তোমার বিয়ে করা স্ত্রী।

আলেয়া নিজেকে বাঁচানোর জন্য আকুল প্রার্থনা জানাচ্ছিল। নিজেকে সৎ প্রমান করার প্রয়াসে অঝড়ে তার দুইচোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগলো।
অন্ধকারেও যেন আমার দুচোখ আলোতে ভরে গেল। আলেয়ার করুণ আকুতি তার স্বামীকে  ছড়িয়ে দিল।

তার স্বামী কিন্তু তার  রুদ্র মুর্ত্তিতে  হো হো হো করে হাসিতে ভরিয়ে দিল সেই রাজপ্রাসাদ। আবার বোমা গুলির আওয়াজ হলো। মাঝরাতে কাক পাখি ডেকে উঠলো। একটা বড় পেঁচা কর্কশ শব্দে আলোড়িত করলো কালো রাত্রিকে।

আর সময় দেওয়া ঠিক হবে না ভেবে প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম। গুলি ছুটে গেল অনেকগুলো। আর আমার পিছন থেকে প্রবল জোরে মাথায় আঘাত পেলাম। মাথা ঘুরে গেল -সব কিছু কালো অন্ধকারে হারিয়ে গেলাম।

চোখ খুলেও খুলতে পারছিলাম না।একটা ঘোরে ছিলাম। আরও সময় লাগলো। যখন একটু ঘোর কাটলো তখন দেখলাম আমি একটা বেডে শুয়ে আছি। মাথায় অসহ্য যন্ত্রনা। হাত দুটো বাঁধা বেডের সংগে। কেউ কিছু বলছেও না দেখছেও না।
সময় এরকম করে এগোচ্ছে আর আমার যেন অনেক কথাই মনে পড়ছে। আরো মনে করার চেষ্টা করতে থাকলাম।পারলাম না মাথায় অসহ্য যন্ত্রনায় কাতর হলাম।
----------------------------

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
পঞ্চম পর্বঃ
~~~~~~ প্রদীপ দে।

চোখ খুলেও খুলতে পারছিলাম না।একটা ঘোরে ছিলাম। আরও সময় লাগলো। যখন একটু ঘোর কাটলো তখন দেখলাম আমি একটা বেডে শুয়ে আছি। মাথায় অসহ্য যন্ত্রনা। হাত দুটো বাঁধা বেডের সংগে। কেউ কিছু বলছেও না দেখছেও না।
সময় এরকম করে এগোচ্ছে আর আমার যেন অনেক কথাই মনে পড়ছে। আরো মনে করার চেষ্টা করতে থাকলাম।পারলাম না মাথায় অসহ্য যন্ত্রনায় কাতর হলাম।

কত দিন পরে আমার মাথা হালকা হলো বলতে পারবো না তবে যখন আগের কথা গুলো মনে হলো তখন যেন কেমন স্বপ্ন বলেই মনে হতে লাগলো। 

কি ভাবে কি হলো বোঝবার জন্য আমি এক নার্সের সঙ্গে ভাব জমালাম। নার্স বেশি কিছু জানতোও না। শুধু জানালো -- এটা একটা পাহাড়ি  অঞ্চলের সাস্থকেন্দ্র মাত্র। আপনি স্টেশনে রাতে ঠান্ডায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। অঞ্জান হয়ে পড়েন। পাহাড়ি আদিবাসীরা আপনাকে উদ্বার করে এখানে নিয়ে আসেন। অতিরিক্ত ঠান্ডার কবলে আপনি নিউমোনিয়া আক্রান্ত হন।

আমি আরো কিছু জানতে চাইছিলাম,কিন্তু পেলাম না। বুঝলাম এরা কেউ জানে না। তবু ও বুদ্ধি করে প্রশ্ন করলাম -- তাহলে আমার মাথায় কিসের আঘাত লেগেছিল?

-- আপনি বসার সিট থেকে উল্টে পড়ে যান। পিছনের মাথায় ধাক্কা লাগে এক বড় প্রস্তরখন্ডে।
তাতেই এই বিপত্তি।

বৃথা চেষ্টা!  আমি চুপ করে গেলাম।
-- কবে ছুটি  হবে?

ডাক্তার বাবু আপনার ছুটি দিয়ে রেখেছেন। আপনি
ইচ্ছা করলে বাড়ি যেতে পারেন।

---  ধন্যবাদ -- জানিয়ে নার্সকে বিদায় জানালাম।

হসপিটাল থাকে বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমেই স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম।

তন্য তন্য করে স্টেশন সংলগ্ন অঞ্ছল খুঁজলাম।
কিছু বুঝতে পারলাম না।
----------------------------

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
ষষ্ঠ পর্বঃ
~~~~~~ প্রদীপ দে।

হসপিটাল থাকে বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমেই স্টেশনের দিকে পা বাড়ালাম।

তন্য তন্য করে স্টেশন সংলগ্ন অঞ্ছল খুঁজলাম।
কিছু বুঝতে পারলাম না।

দিন দশেক বিশ্রাম নিয়েছি।এখন অনেকটাই ভাল লাগছে। মনের জোর নিয়ে ঠিক করলাম আমায় এই ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতেই হবে। এটা স্বপ্ন বলে মাবতে পারছি না। উদ্যোমের সঙ্গে প্রথমেই ওই রাজপ্রাসাদের খোঁজ করতে হবে। পথে নামলাম। শীতকাল দুপুর বারোটা, বেশ আমেজ ছিল। হাঁটতে শুরু করলাম। দেখলাম পাহাড়ি রাস্তা এবড়ো খেবড়ো হয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে। সুন্দর প্রকৃতির প্রকাশ। কোনদিকে যাবো, কাউকে দেখতে পেলে খুব ভাল হত। খানিকটা হাঁটার পর একটা ঝুপড়ি চোখে এল।এক বয়স্ক ব্যক্তি চা তৈরি করছিল। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দোকানে কোন খরিদ্দার ছিল না। দেখে মনে হল
উনি এখানেই থাকেন। আমাকে দেখেও না দেখার ভান করলো।

আমিই জানতে চাইলাম -- চায়ে মিলেগা?

লোকটি কোন উত্তর দিল না। আমি বারবার জানতে চাইলেও কোন উত্তর এলো না। আমার মূল উদ্দেশ্য কাজে লাগলো না।কিছু সাহায্য পাওয়ার আশা ত্যাগ করে এগিয়ে চললাম।

আরো কিছুটা এগিয়েছি, সামনে একটা বাজার পেলাম। বাজার মানে পাহাড়ের কোলে বেশ কয়েকজন সব্জি বিক্রি করছে। ভাল লাগলো।
আশা করে এগিয়ে গেলাম। এক মহিলা সব্জিবিক্রেতার সঙ্গে কথা চালালাম। ভদ্রমহিলা কেন জানিনা কথা বললো এবং অবাক হলাম ভাংগা ভাংগা বাংলায় কথা বললো। প্রথমে এখানকার বিষয় নিয়ে কথা বললাম। পকেট থেকে একটা একশো টাকার একটা নোট ওকে বাঙালি বলে উপহার দিলাম। গরীবলোক কিছুটা লোভে পড়ে গেল। ভাবলো আমি বোধহয় কোন সরকারি  লোক ,কিছু খবর দিলে কিছু পাওয়া যাবে। যপদি মুখে একটু  লাজ দেখালো। কাজ হবে ভেবে খুশি হলাম। ও সব্জি গুটিয়ে নিয়ে আমাকে ইঙ্গিত করলো ,যাতে আমি ওর সঙ্গে যাই। বাজারে ও কোন কথা বলতে চাইছিলো না।

-- চলো আমার সনে।

-- তাই চলো।

দশমিনিট হেঁটে ওর কুঁড়েঘরে গিয়ে উঠলাম।
দৈনদশা কাকে বলে?  মহিলা একটা ভাংগা টুলে বসতে দিল। বললে - চা আনি।
আমি বাইরে বসে আর উনি ভিতরে চা বানাতে গেলেন। চারিদিকে ছোট ছোটো পাহাড়। বেশ মনোরম পরিবেশ।

চা খেতে খেতে জানতে চাইলাম -- এখানে রাজবাড়ি কিছু আছে?

-- কেনে বাবু?

-- না একটু ঘুরে দেখতাম।

ও কোনো উত্তর দিল না।নিজের বাজার ঘোছাতে ব্যস্ত রইলো। দ্বিতীয় বার প্রশ্ন শুনে জানালো -- আগে ছিল এখন আর নেই।

-- কেন,  কোথায় গেল?

-- না, বাড়ি আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

-- সে কি? কেমন করে হল এসব?

আমি ওকে আরো একশো টাকার একটা নোট এগিয়ে ধরলাম। ও নিল। খানিকটা সময় চুপ করে রইলো। তারপর মুখ খুললো।

-- আমি মান্ডি ওই বাড়িতেই কাজ করতেম। কর্ত্তা,গিন্নি আর উদের বাপ টা থাকতো।এ থানের অনেকেই কাম করত উনার বাড়ি। একদিন রাতে সব শেষ হয়ে গেল।

মান্ডি সময় নিল।আমি ধৈর্যের বাঁধ ছাড়াচ্ছি।

-- কি হয়েছিল সে রাতে?

স্বামী -স্ত্রী ঝামালা ছিল। মন অমিল। আমারা জানতেম। এক অমাবস্যায় রাতে স্বামী সকলকে মাইরা সব খতম করে দিল।

আমি কাঁপছিলাম ভিতরে ভিতরে।প্রকাশ করলাম না।

ওই বললে -- সবাই শেষ।

আমি হঠাৎ কি মনে করে জানতে চাইলাম -- সকলের বডি পাওয়া গেছিল?

-- হ্যাঁ।  না ,তবে গিন্নিমার বডি মেলে নি।

তারপর কি হয়েছে জানতে চাওয়ায় মান্ডি জানাল -- ও বাড়িতে আর কেউ যেতে পারতেম না ডর লাগতো। একবার বিতেন গেছিল ও বোবা হয়ে গিয়েছে।

-- সে এখন কোথায়?

-- একটু আগেই ওর ঘর আছে। চা বানায়।

এবার আমি ফেলে আসা বয়স্ক লোকটির কথা মনে পড়লো। বুঝলাম ও তাই উত্তর দেয়নি। অনেক কথা জেনে মান্ডির ঘর ছাড়লাম। ভাবতে লাগলাম এবার কি করি?

গুটিগুটি পায়ে রাজবাড়ির পথ ধরলাম। বিকেল গড়িয়ে পাহাড়ে অন্ধকার নামছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু আমার মন অন্যখানে অন্য কোথাও।
মান্ডির কথাটা মাথায় গেঁথে বসে গেছে - গিন্নিমার বডি মেলে নি --।
---------------------------

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
সপ্তম পর্বঃ
~~~ প্রদীপ দে।

মান্ডির কথাটা মাথায় গেঁথে বসে গেল -- গিন্নিমার বডি পাওয়া যায়নি।

ভারাক্রান্ত মনে হাঁটছি আর ভাবছি কি হতে পারে?
ভৌতিক?  প্রথমে মনে হলেও এখন মন বলছে অন্য কিছু ঘটনা এর পিছনে লুকিয়ে আছে। সেটা আমায় জানতে হবে। আলেয়ার শ্বশুর আমায় কিছু  খুঁজতে বলেছে নিশ্চয়ই। হয়তো ওনার অতৃপ্ত আত্মা এটা চেয়েছে। আর আলেয়া?  সে যদি একটা মৃত ছায়া হয়ে খেলা করে তবে সে কি বোঝাতে চাইছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। তবে ওর স্বামী যে আসল কালপিট তা বোঝা হয়ে গেছে।
সবার ডেডবডি যদি পাওয়া যায়, তাহলে আলেয়ার বডি কোথায় গেল?

চোখ তুলে দেখি আমার স্বপ্নে দেখা ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি আমার সামনে। অনেকটাই অন্ধকার নেমেছে। পাহাড় এখানে বাঁক নিয়েছে। আমি কিছু সময় নির্বোধের মত দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রকান্ড লোহার গেট যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
লোভ সামলাতে পারলাম না। দ্রুতগতিতে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রচন্ড গতিতে একটা ঝনঝনানি আওয়াজ তুলে গেট বন্ধ হয়ে গেল। নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ। গা ছমছম করা ভাব। আমি সাহস করে ভিতরে চললাম - যেন স্বপনের মত আগের ঘোরে আলেয়ার সঙ্গেই।

উঠোন পেরোতেই পিলে চমকে গেল। দেখলাম জমাট বাঁধা অন্ধকারে কালো কালো ছায়া মূর্তি সরেসরে যাচ্ছে। আমি ভুত বলে মানতেও পারছি  না, আবার ভয়ে সিটিয়েও গেলাম। কি করবো বুঝতে পারলাম না।এগোবো, না কি পালাবো? পালানো ই বুদ্ধিমানের কাজ। শুনলাম এখানে এসে অনেকেই বোবা হয়ে গেছে, ভয় পেয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই ট্রেনে আলেয়ার শ্বশুরের আকুতিও মনে পড়ে গেল। এখন আমি কি করবো?  কি করা উচিৎ?  মনে হয় আলেয়া বিপদেই পড়েছিল তাহলে আমি এত ভীতু হব কেন ? আর ম়ৃত আত্মার ইচ্ছা যখন, তখন একবার সাহস করে ঢুকেই দেখি কি আছে কপালে?  
ভিতরে আওয়াজ হচ্ছে। নানারকম। ভুতুড়ে কিনা জানিনা। তবে পরিবেশ ভয়ার্ত রুপ নিচ্ছে। মাকড়সা যেন জাল বিস্তার করে রেখেছে।

উঠোন পেরিয়ে ঘর। সব লন্ডভন্ড হয়ে।ধাক্কা খেলাম টেবিলে। খুব জোরে। ব্যথা সামলাতে যাবো, কোথা থেকে এক মহিলার কান্নার শব্দ পেলাম।সঙ্গে সঙ্গে গুলি ছুটলো - আবার চিৎকার। আবার বোমা গুলি এবার এক পুরুষ মানুষের আর্তনাদে, কিছু হুড়মুড় করে পড়ার আওয়াজ হলো।আমি দিশেহারা হয়ে অন্ধকারে পথ খুঁজতে লাগলাম।

সামনে সিড়ি মনে হল। সময় নষ্ট না করে উঠে গেলাম। মনে হলো কেউ যেন আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। তারপর ফিসফিস শব্দ শুনতে পেলাম।কারা যেন কথা বলছে। 

আর আমি ভয় পাবো না।কারণ আমার আর বেরোনোর উপায় নেই। সিংগের গুহায় যখন ঢূকেই পড়েছি তখন মৃত্যু অবধারিত। মরণ ই হয়তো আমাকে এখানে টেনে এনেছে। সুতরাং মরার আগে অন্তত একবার সাহাস করে আলেয়ার জন্য কিছু করি। এই সাহসে ভর করেই আমি আলেয়ার শ্বশুরের ঘরে উঁকি  মারলাম।

উরি বাবাঃ।দেখে পিলে চমকে গেল।ঘর ভর্তি অশরীরী কালো কালো ছায়া মূর্তি কিছ যেন করছে। ধোঁয়া ভরে রয়েছে।কটু গন্ধ। তবে গন্ধটা যেন বেশ চেনা। জানালা টা আরো একট ভাল করে খুলতে গিয়েই বিপত্তি ঘটিয়ে দিলাম। ভিতরে ছায়ামুর্তিরা লাফালাফি করে উঠলো।দুমদাম আওয়াজ হলো। কান্না হাসির রোল উঠলো। দমকা বাতাসের শব্দ। ভয়ে সিটিয়ে গেলাম। বুঝলাম আমি ওদের নজরে। সবাই আমাকে ঘিরে ফেলেছে। সবার হাতে অস্ত্র। পালাতে গিয়ে পড়ে গেলাম। চারদিকে ভৌতিক পরিবেশ আমাক খেতে এলো। 

হঠাৎই। একটা তীব্র আলোর রোশনাই ছিটকিয়ে এলো। চোখের মধ্যে আলোটা ঠিকরে পরছে। আমি জ্ঞান হারালাম। 
--------------

রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
অষ্টম পর্বঃ
~~~ প্রদীপ দে।
~~~~~~~~~
চোখের মধ্যে আলোটা ঠিকড়ে এলো। আমি জ্ঞান হারালাম।

চেতনা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকালাম। এ আমি  কোথায়? চারদিকে উর্দ্দিধারী পুলিশ। আমি একটা চেয়ারে বসে। চোখে মুখে জলধারার অবশিষ্টাংশ। আমাকে একজন ধরে রয়েছে পিছু থেকে। আবার সব মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে পড়তে সময় লাগলো না। আমি ভুতের গুহায় ছিলাম - কি করে যে এখানে এলাম বুঝতে পারছি না।বোঝার চেষ্টা করছি। তার মানে আমাকে পুলিশে ধরে রেখেছে।
আমি কি কিছু অন্যায় করে ফেলেছি? এই সব ভেবে ভীতু এক লেখক হাত পা পেটের মধ্যে নিয়ে ফেলেছি।

সামনে ওসি বসে। আমাকে দেখে হাসছে। আরো ভয় পেয়ে গেলাম এবার বুঝি আমায় কোর্টে চালান দেবে।।চার পাশে অনেক আদিবাসী লোক দাঁড়িয়ে ভিড় করে রয়েছে।সকলেই মজা দেখছে যে এক বাইরের লোক এসে এখানে ঝামেলা করেছে।
আমি সকলের মুখগুলি দেখছি। হঠাৎই চোখে এল মান্ডিকে আর সঙ্গে সেই বোবা চা ওয়ালাকে। আমি আরো ঘাবড়ে গেলাম।

ওসি আমার দিকে চেয়ে মুচকি -মুচকি হাসছে। বোঝাচ্ছে দ্যাখ বেশি পাকাপোনা করার ফল কেমন পাস। 

হঠাৎ ওসি একেবারে শুদ্ধ বাংলায় বললে -- কি খুব ভয় পেয়েছেন?  আপনি তো বেশ সাহসীই!

আমি একটু অবাক হলাম। বুঝলাম উনি একজন বাঙ্গালী।

-- না না ভয়ের কিছু নেই। আপনি শান্ত হয়ে বসুন। আপনার চেষ্টায় আজ একটা বিরাট অভিযানে আমরা সফল হয়েছি।

আমি কি শুনছি?  বুঝতে না পেরে বোকার মত চেয়ে রইলাম।

ওসি সাহেব বললেন -- আপনার সাহসের জন্য আজ বহুদিন বাদে একটা ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হল। জানেন আপনি কতবড় কাজ করেছেন?

আমি ভুত ছাড়া কিছুই জানিনা। তাই উত্তর দিতে পারলাম না।চুপ করে জানতে চাইলাম।

ওসি বললো -- একটা স্মাগলিং গ্রুপ আজ ধরা পড়লো। যারা বছর তিনেক ধরে ওই ভগ্নপ্রায় রাজবাড়িতে ভুত সেজে কারবার চালাচ্ছিল। আমাদের ও বোকা বানিয়ে রেখেছিল।  এখান কার সব আদিবাসীও ভয়ে তাই বুঝতে পারেনি।

আমি মান্ডির মুখের দিকে চাইলাম। ওসি দেখলো।  -- হ্যাঁ।  ঠিকই এই মান্ডির জন্য আপনিও বাঁচলেন। আমরাও রাস্তা পেলাম। ওই এসে খবর দিয়েছিল যে আপনি রাজবাড়ি যাচ্ছেন।

এবার আমি জানতে চাইলাম -- কিন্তু মান্ডিকে তো আমি কিছু বলিনি?

-- না ও জানতো আপনি সেই কাজেই খবর সংগ্রহ করছেন।

আমি অবাক। আরো অবাক হলাম যখন ওসি আরও ভেঙ্গে বললেন।

-- আর ওই চা ওয়ালা হারুণ আদৌ হাবাবোবা নয়। ও রাজবাড়ির সব ব্যাপারটা জানতো।সব ধরে ফেলেছিল।তাই ওকে প্রানে মেরে দিতেও গেছিল। ও ওদের কাছে প্রতিঞ্জা করে ছিল ও সারাজীবন বোবা সেজেই থাকবে।কাউকে কিছু বলবে না। এটা যদিও সহজে হয়নি আপনার ওই আলেয়ার স্বামী রাজকিশোর বাবুই ওকে মাপ করে দিয়েছিলেন। কারন ও ছিল ওদের বংশের ই ওরসজাত এক পুর্বপুরুষ। হারুণ যদি আমাদের এই কথা আগে জানাতো তাহলে আমরা কাজটা সহজেই করতে পারতাম।আজ আপনার বিপদ  দেখে মান্ডি ই ওকে এখানে নিয়ে আসে। আর এই সুযোগে আমরা আপনার পিছনে ধাওয়া করি - আপনাকে বুঝতে না দিয়ে --তাই কাজটা সহজ হলো।

আমি বোকার মত চেয়ে  -- তাহলে ভুতেরা? আর অতো শব্দেরা?

-- ওগুলো সব সাজানো। লোককে বোকা বানাতে। আমরা তো ভুত না মানলেও ওই বাড়ি নিয়ে মাথাই ঘামাই নি। রাজকিশোর জমিদার আন্তর্জাতিক চোরাকারবারের একজন হর্তাকর্তা।
আজ সবাই ধরা পরে গেল।

আমি আশস্ত হলাম। আসল প্রশ্নের উত্তর খুজঁতে  ওসির মুখে থাকালাম।

-- না। সরি ওদের বাঁচাতে পারিনি। ওরা অনেক আগেই ওর শিকার হয়ে গেছিল।

-- কিন্তু কেন?

-- আলেয়ার শ্বশুর মানে রাজকিশোরের বাবা এটা মানেনি। প্রতিবাদ করেছিলেন। বৌমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন কি করা যায়। আলেয়াও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। রাজকিশোর বুঝতে পেরে সেই রাতেই ওদের শেষ করে দেয়।

-- ওদের কি ডেডবডি পেয়েছিলেন?

-- আলেয়ার পাওয়া যায়নি। এটা রহস্য ই রয়ে গেছে।

আমি চুপ। এবার আমি কি করবো? আমার কাজতো শেষ হলো না।আলেয়া কোথায় হাওয়া হয়ে গেল। ও যে আমার বড়ই প্রানের। ওই তো আমায় টেনে এনেছে এখানে। আমি শেষ দেখতে চাই!

-- যাক। আপনার নাম আমরা প্রধান দপ্তরে  পাঠিয়েছি একজন সাহসী লেখক  হিসাবে। আপনি এখন কি করতে চান?

আমার মাথায় আর  কিছু কথা ঢুকলো না।আমি ওদের ধন্যবাদ জানিয়ে থানা থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। মান্ডি আর হারুণ আমার সঙ্গে এলো।
আমার হাত ধরে নিল -- সাব আমাদের কোঠিমে চলিয়ে ---।
-------------
  
রহস্যগল্পঃ
আমার আলেয়া
নবম পর্বঃ
~~~ প্রদীপ দে
~~~~~~~~~
মান্ডি আর হারুণের হাত ধরে মান্ডির ঘরে চলে এলাম। মান্ডি বেশ খাতির করছে। হয়তো ওদের মালকিন কে ওরা ভালবাসতো তাই। আমিও ওদের পারলে একটু খুশি করি এমনই ভাব খানা।
মান্ডি খাবার বনাতে থাকলো। আমি আমার ব্যাগ ঘোছাতে ব্যস্ত রইলাম।

মান্ডি জানতে চাইলো - কেয়া বাত সাব?

আমি চাইছি কিছু কথা আলোচনা চালাতে। ওদের জানাতে চাইছি আমার মনের দন্ধটা।

ওরা বুঝতে পারলো। কিছু খাবার খাওয়ার পর আমরা তিনজনে বসে পড়লাম।

-- সব রহস্য রয়ে গেছে। আমাকে আলেয়াই সমস্ত ঘটনা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। সম্ভবত ওর আত্মাই এই কাজ করে থাকবে। তা হলে ধরে নিতে হয় ও মারা গিয়েছিল --।

হারুন আর কথা বলতে দিল না -- বাবু সাব আপকা থোরাসা গলতি হোতা হ্যায়।  উসিকা শ্বশুর জি আপকো এহি সব বাতায়া, দেখায়াভি।

মান্ডি সব কথা শুনে হারুনকে বললে  -- এক কাম কিজিয়ে দা 'সাব গুনিনজিকি পাশ চলিয়ে -- সব সাচ মিল যায়েগা।

হারুন লাফিয়ে উঠলো -- এহি একদম আচ্ছা হোগা।

আমি চুপ করেই ছিলাম। আমি এইসব বিশ্বাস করিনা।

হারুন সব বুঝে গেল। -- দেখিয়ে সাব আভি দুসরা কহি রাস্তা নেহি। এ গুনিন বহুৎ পুরানা আদমি হ্যায় ইধারকা। একবার যানেসে মালুম হো জায়েগা। আউর রাস্তা ভি মিলেগা।

মান্ডিও রাজী। আমার এখন ছটফটানি মন। মানতেও পারলাম না ফেলতেও পারলাম না। একপ্রকার রাজী হয়েই গেলাম।

গ্রামের শেষে শশ্মান। আর তার বা পাশে যে পাহাড় টা ঢালু হয়ে নেমে এসেছে তার পাশেই পর্ণকুটির।
মান্ডি আর হারুন ঢুকে কথা বলে এলো।আমাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকতেই গুনিন টি চিৎকার জুড়ে দিল -- এ কৌন আছে?  ইসিকা সাথ বিশ্বওয়াস না আছে।

ব্যাটা বুঝতে পেরেছে আমার কাছ দিয়ে ওর আমদানি ভাল হবে না।

মান্ডি আর হারুন ও সব কিছু শুনেও শুনলো না। ওনাকে সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বললো। গুনিঞ্জী সব ধৈর্য ধরে শুনলো -- গুনানে পড়েগা।

গোনা - গুনির কাজ করতে থাকলো।মান্ডি আর হারুন হাত জোর করে বসে।আর আমি মজা দেখতে থাকলাম। অনেক সময় চলে গেল।

গুনীনিজি গুনে গুনে অস্থির হয়ে উঠলেন। সঙ্গে ছিল মড়ার খুলি, বড় বড় কড়ি আর তামার পয়সা।
হাঁক দিয়ে জানালে -- নেহি নেহি ও আভিতোক জিন্দা হ্যায়।

আমি তড়াক করে উঠলাম। মনের মত কথা। কিন্তু ব্যাটার ছেলে ভন্ড কায়দা  মারছে এই ভেবে চুপসে গেলাম। চক দিয়ে এঁকে  বললেন -- ভাগবান কা দিক মে দেখাতা হ্যায়।

আমি লেখক হওয়ার কারনে ওর হেয়ালি সহজেই বুঝে গেলাম -- মানে উত্তর দিকের কথা বলছে।

মান্ডি আর হারুন না বুঝে অনেক প্রশ্ন করে চলেছে।অনেক কিছু জানতে চাইছে আর ভন্ড সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।

একটা কথা আমার কানে এল - উসিকা শ্বশুর জী কা প্রেত মেই এয়সা কুছভি কিয়া থা।
উসকা শান্তি  হুয়া নেহি। আলেয়া কা রুপসে ওহি দেখা দিয়া। হামারা হিসাব নিকলায়া আলেয়া আভিতোক জিন্দা হ্যায়।  কথা গুলো ও বেশ জোরের সঙ্গেই বললো।

অনেক কিছু জানার পর আমারা তিনজন ওখান থেকে ফিরে এলাম।

সুযোগ খুঁজছিলাম। মধ্যরাতে সকলে ঘুমালে আমি অতি সন্তর্পণে ঘর ছাড়লাম।

পথ খুঁজে আবার স্টেশনেই চলে এলাম।জানতাম, যে ট্রেন টায় আমি এখানে নেমেছিলাম, সেই ট্রেন টা এখনি এখান দিয়ে পাশ করবে। টিকিট কাটার কথা মনে এলো না।শুধু একটা কথাই মনে বসে গেছে - উত্তর দিক। বারবার জলন্ধর নামটা চলে এসেছিল। তার মানে কি বোঝাতে চাইছিল সবাই?
যদি ভুতের কথাই মানি অথবা ভগবানের কথাই মানি - তাহলে উত্তর দিক মানে জলন্ধর কেই বোঝায়। সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না আর সবাইকে নিয়েও কাজ করা যাবে না।তাই লুকিয়ে চলে এলাম ।

ট্রেন এসে গেল। জলন্ধর এক্সপ্রেস। তড়িঘড়ি উঠে পড়লাম। কোনকিছু না দেখে না বুঝে। উঠেই বিপদ! এ আবার অন্য ফ্যাসাদে পড়লাম। চক্ষু চড়কগাছ। একেবারে ধরা পড়ে গেলাম --।
---------------------

রহস্যগল্পঃ
দশম এবং অন্তিম পর্ব
আমার আলেয়া
~~~ প্রদীপ দে।
~~~~~~~~~
ট্রেনে উঠেই দেখি একেবারে কালোকোর্ট পড়ে চেকার সাহেব যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছে।
টিকিট নেই তার উপর ফ্রাস্ট ক্লাস। অল্প টাকা ছিল, ম্যানেজ হলো না। তার উপর চেকারের দাবি ওনাকে রসিদ কাটতেই হবে। নাহলে অসুবিধা, ওনাকে ডেলি কিছু কেস নাকি দিতেই হয়। আমাকে নিয়ে জলন্ধর স্টেশনে নিয়ে অফিসারের কাছে তুলে দেবে। উনি মাফ করলে মাফ। আমার অসুবিধা হওয়ার কথা নয় দিব্যি দাঁড়িয়ে  রইলাম। ভোর বেলায় তো নেমেই যাব।

অনেক টিকিট বিহীন যাত্রী ছিল ট্রেনে। সবাইকে নিয়ে জি আর এফ স্টেশনের একটা ঘরে তুললো।
আমি নিরুপায়। উপায় পাচ্ছি না।

ভুতের বোধহয় বিশেষ কৃপা আমার উপর। না হলে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসি। তাই হল, থানার বাঙ্গালী ওসি আমাকে দেখে দৌড়ে  এলেন -- আরে  আপনি?

সব জানলেন। একমিনিট লাগলো না, আমি ছাড়া  পেয়ে গেলাম। উনি খাতির করে আমায় জীপ গাড়িতে  তুললেন -- দেখেছেন কি কান্ড? কাল রাতে আমি জীপ নিয়ে জলন্ধর এসেছিলাম।এখন ফিরতি পথে আপনাকে এই অবস্থায় দেখে ফেললাম।  যাক কোথায় যাবেন?  নিশ্চয়ই কোন অভিযানে।

হেসে ফেললাম। সত্যি উনি একজন সজ্জন ব্যক্তি।  উনি আমার জীবনদাতা। ওনাকে সব খুলে বললাম আমার মনের ইচ্ছা। গুনিনের কথাও জানালাম।

উনি এক মিনিট চুপ করে থেকে বললেন -- আমার কাজ হয়ে গেছে। ফিরছিলাম। তা আপনার কাজে আমায় নিতে পারেন। আমারও খুব ইচ্ছা হচ্ছে। যদি সঙ্গে যেতে পারমিশন দেন?

আমি লজ্জায় মরে গেলাম -- আরে এ আপনি কি যে বলেন? আমি পারমিশন দেব? আরে আপনি সঙ্গে থাকলে আমার কাজ সার্থক হবে এব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

-- তা হলে কাজটা আমায় করতে দিন। মানে আমি ই অপারেশন টা করবো। আর আপনি শুধু সঙ্গে থাকবেন। আমি এখানকার সব চিনি এবং আমাকেও সবাই চেনে।

আমি খুব খুশি হলাম। হাত বাড়িয়ে দিলাম -- একদম।  উনিও হাত মেলালেন -- ডান।

জীপ ছুটে চললো। পাহাড়ি এলাকায় ধুলো উড়ছে - মুখ চোখ কালো হয়ে যাচ্ছে। এক দুর্নিবার আকর্ষণ আমাদের রোমাঞ্চিত করতে থাকলো।

বুঝলাম উনি অভিঞ্জ। উনি পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছেন।  চুপচাপ ওনাকে ফলো করতে থাকলাম।

অনেক পথ পার হলাম।জীপ এসে থামলো একটা বড় গেটের সামনে। ভিতরে গাছ, ফুলের বাগান। ইংরেজি তে লেখা " মিশন" । ব্যাপার টা বুঝলাম। উনি আমাকে নিয়ে ভেতরে গেলেন। একটা অফিস গোছের ঘরে দেখলাম দুইজন মহিলা বসে আছেন।
বাঙ্গালী ওসি ভদ্রলোক ওনার পরিচয় দিলেন। এতক্ষণে ওনার নাম জানতে পারলাম -- পরিমল ভট্টাচার্য। আগে নামটা জানা হয়ে ওঠেনি। 

পরিমল ওসি সব বুঝিয়ে বললেন।  ওনাদের হেল্প চাইলেন। দুই মহিলা বেশ শিক্ষিতা ও রুচিশীলা বলেই মনে হল। রেজিস্টার খুলে দেখলেন কি সব।
দু তিনবার ফোনে কথা বললেন। বুঝলাম বছর দুই বা তিন আগের আগত মহিলাদের খবরাখবর সংগ্রহ করতে চাইছেন উনি। দুটি আশ্রমের নাম লিখে দিলেন। আমরা বেড়িয়ে পড়লাম সন্ধানে।

পরের আশ্রমে এসে ওসি অনেক খবর নিলেন। ভিতরে গিয়ে খোঁজ ও করলেন। সুবিধা হলো না।

গাড়ি ছুটেই চললো সারাদিন। অনেক ঘোরাঘুরি করে অসফল হয়ে পড়েছি। যাবার সময় শেষ একটা আশ্রমে পৌঁছুলাম। বিকেল হয়ে গেছে।সূর্য ডুবুডুবু। পাহড়ি এলাকা রক্তিম আলোয় ঢেকে গেছে। ম্যানেজার চেষ্টা করছিলেন।আমরা ঘরে বসে। সামনে বড় লোহার রডের জানালা। সমস্ত আশ্রমের মহিলারা বাগান ছুঁয়ে প্রার্থনা স্থলে যাচ্ছেন, আমি সেই দৃশ্য দেখছি। হঠাৎই চমকে উঠলাম, আলেয়া যেন চলে গেল মনে হল। হয়তো  আমার মনের ভুল, আমি চকিতে জানালার সামনে চলে গেলাম। ও কি আমায় দেখেছে?  জানিনা।  তবে ওসি পরিমল বাবু ঠিক দেখে নিয়েছে। সত্যি  স্বীকার করছি একজন ওসি হিসাবে উনি একদম নিখুঁত। নিখুঁত ওনার চাল। উনি সবেগে ভিতরে চলে গেলেন। 

আমি বাইরে ছটফট করছি। আধাঘন্টা কেটে গেল। কোনো খবর নেই। পরিমল বাবু শেষে বেড়িয়ে আমায় একটান মেরে বাগানের দিকে নিয়ে গেলেন। আমি জানতে চাইলাম। উনি হাসলেন -- ইউ আর গ্রেট!

দুরে একটা বেঞ্চে বসেছিল আলেয়া। আমি দেখে অবাক। দেখি ও আমাকেই দেখছে। পরিমলবাবু অল্পকরে বললেন -- বদমাশদের একজন ওনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন - ম়ৃত বলে।

আমি শুধুই আলেয়াকে দেখছি। কিছু জানার প্রয়োজন নেই। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ওটা ওসির কাজ উনিই করুক। আলেয়ার পাশে গিয়ে বসলাম। ওর হাতটা ধরলাম। আলেয়ার চোখে জল -- বাবা মার লোভ আজ আমাকে এখানে এনে ফেলেছে।

আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম। ও করুন ভাবে অনুরোধ করলো -- তুই আমাকে যেতে বলিস না।আমি শেষ জীবনটা এখানেই থাকতে চাই।

আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে।তাই মেনে নিলাম।
পরিমল বাবু অফিসিয়াল কাজে ওকে নিয়ে আশ্রমের অফিসে হানা দিল।

আমি বাইরে দাঁড়িয়ে।  কিছুবাদে ওসি পরিমলবাবু জীপ থেকে আমায় ডাক দিলেন -- লেখক বাবু চলে আসুন, আমার কাজ হয়ে গেছে, এবার ফিরতে হবে। আমি একবার আশ্রমটাকে ভাল করে দেখে নিলাম যদি আর একবার আলেয়ার দেখা পাই। -- না আর দেখা হল না।

এগিয়ে জীপের সামনের সীটে বসতে যাবো, পরিমল বাবু ইশারা করে পিছনে বসতে বললেন, খারাপ লাগলো উনি বোধহয়  আমাকে আর কাছে বসাতে চাইছেন না। পিছনে উঠে বসেই অবাক -- এ কাকে দেখছি?  

আলেয়া আমার হাতটা ধরে টেনে নিল --আমি একেবারে ওর কাছে চলে গেলাম। ও আমার কাছে আরো সরে এল -- আমি পারলাম না, তোকে ফেরাতে -- বলেই হুহু করে কেঁদে  উঠলো।

সামনে বসে স্ট্রিয়ারিং হাতে পরিমলবাবু হেসে উঠলো -- আমি থাকতে তা আর কি করে হতে দিই --???
জীপগাড়ি ছুটে চললো -----।
সমাপ্ত।
-----------------------------------
#অমাদীপ_প্রদীপদে

Thursday, 29 July 2021

উবাচঃ

Labels:

Tuesday, 27 July 2021

উবাচ

Labels:

Friday, 23 July 2021

কবিতা

Labels:

Wednesday, 21 July 2021

উবাচঃ

Labels:

Saturday, 17 July 2021

উবাচঃ

Labels: