অমাদীপ_প্রদীপদে
Thursday, 29 July 2021
Tuesday, 27 July 2021
Friday, 23 July 2021
Wednesday, 21 July 2021
Saturday, 17 July 2021
Thursday, 15 July 2021
Wednesday, 14 July 2021
Sunday, 11 July 2021
গল্পঃ
অণুগল্পঃ
" বৃষ্টির বসন্ত "
প্রদীপ দে~
বৃষ্টি রোদ কে এড়িয়ে চলে। মেঘে' র কথা না শুনে।
যে মেঘ তার প্রানের বন্ধু, যে নিয়মিত তাকে সঙ্গ দেয় তাকে কিভাবে বোঝাবে তা বুঝে উঠতে পারে না। রোদ- ই প্রথম তাকে প্রপোজ করে। তখনও বৃষ্টি রোদ কে ভাল মত চিনে উঠতে পারেনি। মোহ ভঙ্গ হতে সময় লাগে না। দ্বিতীয় দিনেই সব মালুম হয়ে যায় বৃষ্টির। হোটেলে খেতে নিয়ে গিয়ে ভাড়া করা ঘরে তার দেহলোভ দাঁত বার করা ইচ্ছা ঝুলি থেকে বাঘ বেড়ানোর মতনই বেরিয়ে পড়ে। খুব জোর বৃষ্টি বেঁচে আসে সে যাত্রায়।
বিমর্ষ আর ভেঙে যাওয়া মন নিয়ে ছুটে চলে বৃষ্টি। নিজের জীবনে প্রথম প্রেম তাকে যে আঘাত দিয়েছে রোদ, তার বদলা নিতে বৃষ্টি ফুঁসে ওঠে।
কোনো এক বর্ষায় সে নিজেকে উজাড় করে দেয় তার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অভিলাষে। আনন্দ নৃত্য শুরু করে দেয়। শুরুতে ছন্দোবদ্ধ তার পর পরেই শুর করে দেয় তার অবাধ্য তান্ডবলীলা! প্রবলভাবে প্রবলবেগে রণংদেহী মূর্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে রোদের উপর। চালাক রোদ পলায়ন করে। তেজী পিতা তাকে আড়াল করে। সে এক বিভৎস অবস্থা! চতুর্দিকে কালো কালো অন্ধকার নেমে আসে। মেঘ যে তারই বন্ধু! বন্ধুকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেই নয় তাকে আগলে রাখতেও বদ্ধপরিকর।
বৃষ্টি তার চতুর্দলায় চড়ে ভাসাতে থাকে সব কিছু। প্লাবন শুরু হয়ে যায় কিছু সময়ের ব্যবধানেই। বিপদ বাড়ে। প্রেম প্রতিশোধের এই অমোঘ পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করতে পবন তার বন্ধু বসন্তের শরণাপন্ন হয়। বসন্ত বৃষ্টিকে কামনা করতো মনেপ্রাণে। কিন্তু তা হওয়ার সুযোগ আসেনি। বসন্ত এসে তার সাহসী বুকে জাপটে ধরে বৃষ্টিকে। ক্রোধান্বিত বৃষ্টি শীতল স্পর্শে অজান্তেই বসন্তের বাহুলগ্না হয়। শান্ত হয়ে যায় সে- এটাও যে প্রেম। বৃষ্টি হারিয়ে যায় বসন্তে!
`````````````````
#অমাদীপ_প্রদীপদে
Labels: সাহিত্যপত্র
Thursday, 8 July 2021
Wednesday, 7 July 2021
গল্পঃ
অণুগল্পঃ
" আল্লাহ সব জানে "
প্রদীপ দে
দুপুর কি নিশুতি রাতের চেহারা নেয়। আষাঢ় শেষ না হয়েই সেই ভয়ংকর কালো মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠলো আজ। বজ্রপাতে খানখান করে দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে তুললো তার বজ্রধ্বনি। বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে যার শুরু সেই ফোঁটা প্রবল রূপে সজোরে মাটিতে আছড়ে পড়তে বেশি সময় নিল না। আর কাল হল সেখানেই। রহমানের জ্বলে যাওয়া কাঠামোর পক্ষে ওইটাই যথেষ্ট ছিল।
করোনা ভাইরাসের প্রভাব সামান্য কমেছিল। রহমান সকালে নাস্তা সেরে মাঠে হাল ধরেছিল। রোজের মতোই। ফরেমা বিবি ভেবে ছিল আজ আর সে মাঠে দুপুরের খাবার নিয়ে যাবে না। তাই ছেলে আতাউরকেই পাঠিয়েছিল মাঠে টিফিন বাক্স হাতে। তখনও ঘর্মাক্ত রোদ গা জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। কে জানে মিনিটের মধ্যেই আকাশ তার মূর্তি বদল করে নেবে। এত হিংস্র হয়ে উঠবে। আল্লাহ বোধহয় সব জানে। সেই পারে এর উত্তর দিতে!
ফেরার সুযোগের দূর অস্ত। ছেলে আতাউর টিফিন বাক্স নিয়ে মাঠের প্রান্তে পৌঁছেও গেছিল। তাকে হাত ধরে সজোরে টেনে নিল আয়েশা, তাদের মাঠের প্রান্তে বেড়ার কুটিরে। নইলে ছেলেটা যে মারা যাবে!
আর বেড়ার জানালা দিয়ে আতাউর চাক্ষুষ উপলব্ধি করলো তার বাপজানের সলিল সমাধি।
আকাশ থেকে নেমে আসা অগ্নিকুন্ড তার বাপকে কোন সুযোগই দিল না আত্মরক্ষার। প্রচন্ড আওয়াজে কেঁপে উঠলো ধরনী। বালক আতাউর বেগে ঘর থেকে বেড়োতে চাইল,কিন্তু আয়েশার পরিবার তাকে আঁটকে দিল। ক্ষেতে জলপ্লাবনে তার বাপজানের দেহটাকে ভাসিয়ে নিয়ে চললো, হয়তো আতাউরকে শান্ত করতে তার বাপের চিতায় জল ঢেলে। আতাউর কিছু জানে না সে শুধু দেখেছে কেউ মারা গেলে তাকে মাটির তলায় কবর দেওয়াই হয়! এ নিয়ম কেন পাল্টে গেল? অবাক বালক আতাউর এ প্রশ্নের উত্তর পেল না। তাকে কেউই এর উত্তর দিতে পারেনি।
আল্লাহ -ই জানে এ প্রশ্নের উত্তর!
--------------------
#অমাদীপ_প্রদীপদে
Labels: সাহিত্যপত্র
Tuesday, 6 July 2021
Monday, 5 July 2021
অস্ট্রেলিয়া সিডনি থেকে -
#ছোটগল্পঃ
" সীতাহার বিভ্রাট "
প্রদীপ দে ~
আমি প্রনয়ী সাজতে ভালোবাসি। ইচ্ছা আছে উপায় নেই। অভাবের ঠিক নয় তবে স্বচ্ছল পরিবারও নয়। স্বামী প্রাইভেট কোম্পানির এক চাকুরে। যা আয় হয় তাতে সংসার চলে যায় তবে বিশেষ কিছু জমে না। সখ আহ্লাদে কেরামতি করতে হয়। চাইলেই কিছু পাওয়ার নেই। যেটা পাওয়া যায় তা স্বামীর অফুরন্ত ভালোবাসা। প্রনয় আমাকে খুবই ভালোবাসে। সেখানে কোন খামতি নেই। দুজনাই দেখতে যেমন, মনের দিক থেকে তেমনই উদার।
বন্ধুরা লোভ দেখায় --
-- তোকে দেখতে এত সুন্দর,সাজলে আর কত না ভাল লাগবে!
আমি হেসে উড়িয়ে দিই, --
-- আমার স্বামীকে দেখেছিস কত সুন্দর? সুন্দরকে সাজতে হয় না, বুঝলি?
জানালা দিয়ে চাঁদকে দেখে মন ভরাচ্ছি, স্বামী এসে কড়া নাড়তেই চিটকানি খুলে দিলাম। আর দরজা বন্ধ করার সুযোগ পেলাম না, প্রনয় আমাকে জড়িয়ে ধরেই বেশকয়েকটা চুমু বসিয়ে দিল গালে মুখে আর ……
-- এমাঃ এমাঃ কি করো, ছাড়ো ছাড়ো, দরজা যে খোলা - ছিঃ ছিঃ ……
-- না না ছাড়বো না -ওঃ কিচ্ছু হবে না।
আমি জোরে ছিটকে বেরিয়ে গেলাম। মুখ ভেঙালাম --
-- এক্কেবারে অসভ্য!
হাত পা ধুয়ে এলে আমি চা বিস্কুট দিলাম। সব দূর থেকে করতে হচ্ছে কখন যে ওর হাতে ধরা পড়ে যাবো! কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ে গেল। চমকে গেলাম ওর কথায় আর কাজে। একটা জুয়েলারি বাক্স খুলে দেখাতেই - ঝকঝকে আলো ঠিকরে বের হল যেন, - নীল ভেলভেট বাক্সে সাদা মুক্তোর একটি সীতাহার!
থাকতে না পেরে সামনে চলে গেলাম আর ও আমাকে টেনে কোলে বসিয়ে নিল -- দেখো --দেখো সোনা এটা কত ঝলমলে?
-- এটা কোথায় পেলে?
আমার চোখে বিষ্ময়ের সুর।
-- না সোনা এটা আমার নয়। আমার এক বন্ধু হিতেশের, ওরা বাইরে যাচ্ছে -তাই আমার হেফাজতে রেখে গেল -- ফিরিয়ে দিতে হবে।
-- ওহঃ তাই বলো -- আমি লোভ সামলে নিলাম।
নেশা কিন্তু চোখে লেগে রইলো -- স্বামীর আদর মাথায় এলো না।
একদিন প্রনয়ের বাড়ি ফিরতে দেড়ি দেখে নিজের মত সাজতে লাগলাম। সাজার শেষে আয়নায় বারবার নিজেকে দেখি আর ভাবি কখন আমার স্বামীকে দেখাবো। হঠাৎই কি যে হল আলমারিতে রাখা সীতাহারের বাক্সটার দিকে নজর গেল। স্বামীকে তাক লাগাতে সীতাহার গলায় ঝুলিয়ে নিলাম। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই ঝলমল করে উঠলো সব কিছু, আমি নিজেই চমকে গেলাম। আর তখনই কড়া নড়ে উঠলো। স্বামী এসে গেল, অনেক আগেই। প্রনয় আমার সাজা দেখেই মজা পেয়ে গেল - ওহঃ শব্দে আমায় জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলো অনেক। কিন্তু একটুও রাগ করলো না। ওর মোবাইলে আমার কয়েকটি ছবি তুলে নিল। আমাকে যে আর ছাড়ে না। আমিও কায়দা করলাম --
-- সব সাজ নষ্ট হয়ে যাবে যে...
ও ভুল বুঝে ছেড়ে দিল। কিন্তু আবদার করলো-- -- চলোনা পাশের লেকে একটু বেড়িয়ে আসি। এত সুন্দর সেজেছো সবাই দেখুক একটু।
কি মনে হল রাজী হয়ে গেলাম।
পাশেই লেক। সন্ধ্যা সাতটা হবে। কিন্তু আলোগুলো সব নেভানো ছিল। কিরকম খারাপ লাগলো। ভয়ও পেলাম। আর স্বামী সুযোগ পেয়ে গেল অন্ধকারে আমাকে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো। কি আর করা যাবে স্বামী যে! - ধরা দিলাম।
হঠাৎই খসখসে আওয়াজ ঘাস মারানো, চটি জুতোর শব্দ আমাদের ঘিরে ধরলো। চারটে লোক হাতে চকচকে ছুঁরি নাচাচ্ছে। ভয়ে হাত পা পেটে ঢুকে যাওয়ার উপদ্রব। বুঝতে বাকি রইলো না - ওরা আমার চকচকে হার দেখে ফেলেছে। সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। প্রনয় বাঁধা দেওয়ার জন্য ছটফট করছিল। আমি একহাত দিয়ে ওকে চেপে ধরলাম যতদুর দৃষ্টি যায় সাহায্যের খোঁজ করলাম। কাউকেই পেলাম না। যা ও দু একজন দুরে ছিল হঠাৎই হাওয়া হয়ে গেল। প্রনয় চেঁচাবার চেষ্টা করতেই ওরা ছুঁরিটা ওর গলায় চেপে ধরলো।
আমি অসহায় হয়ে এতটাই ভীত হলাম নিমেষে গলার সীতাহার খুলে দিয়ে দিলাম। ওরা ওটা নিয়েই দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমার হাত পা কাঁপছিল। ভয়ে আর লজ্জায় চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। প্রনয় হতচকিত তবু আমায় চেপে ধরে স্বান্তনা দিতে থাকলো।
ভয়ে ভয়ে দুদিন দুজনায় কাটালাম।আমি এতটাই লজ্জায় পড়ে গেলাম যে স্বামীর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলাম। আমার নিজেকে সাজানোর লোভ এতবড় বিপদ ডেকে আনলো। নিজেকে বড় ছোট মনে হল। অবাক কান্ড, স্বামী প্রনয় কিন্তু আমাকে ভুল বুঝলো না। উপরন্তু আমাকে কাছ ছাড়া করতে চাইলো না। তাই অফিসেও গেল না।
সমস্যা হলো প্রনয়ের বন্ধু হিতেশের ফেরার সময় এসে গেল। প্রনয় আমাকে নিয়ে বসে পড়লো। ব্যাঙ্কের জমা, আমার অলংকার যোগ করেও তেমন সুবিধা হলো না। শেষে অফিসে লোনের আবেদন করে দিল। লোন পাওয়া গেল, মাসে মাসে মোটা টাকা কেটে নেওয়ার চুক্তিতে। স্যাঁকড়ার দোকানে গিয়ে মোবাইলে তোলা ছবি দেখিয়ে হুবহু আরো একটা মুক্তোর সীতাহার তৈরী করা হল। সব হল ঠিকই কিন্ত মনের মধ্যে একটা দগদগে ঘা রয়েই গেল।
ভয় পেলাম এইভেবে আমাদের এই অভাবের সংসারে অভাব আরো বাড়বে।
যথা সময়ে হিতেশ বাড়ি চলে এল গয়না ফিরিয়ে নিতে। আসলে প্রনয়ই ওকে বাড়িতে ডেকেছিল। ওর ভয় হয়ে গেছিলো, গয়না নিয়ে বাইরে যেতে।
আমি সঙ্কোচের সঙ্গে চা বিস্কুট দিলাম।
প্রনয় ওর জুয়েলারি বাক্সেই ওটা ফেরত দিল। হিতেশ কোন সন্দেহ করলো না। হিতেশ ওটা নিয়ে উঠতে যাচ্ছে এমন সময়ে আমার স্বামী অনুরোধ করলো ---
-- একটু দেখে নিস প্লিজ!
-- আরে দেখার কি আছে ?
-- না না আছে, বন্ধু আছে। সব কিছু দেখে নিতে হয়।
-- আরে ধুৎ। তুই কিযে বলিস ? --
বলতে বলতে হিতেশ বাক্সটি খুলে সীতাহারটি দেখলো। বন্ধ করতে গিয়ে আবার দেখলো। কিছুক্ষণ চিন্তা করে জিজ্ঞাসা করলো, --
-- এটা যেন আরো চকচকে লাগছে মনে হচ্ছে ?
ব্যাপারটা কি ?
প্রনয় বুঝলো সে ধরা পড়ে গেছে। বন্ধুকে বসিয়ে সব কথা বলে দিল। ও চায়নি পরে ঝামেলা হোক।
আমি পাশে দাঁড়িয়ে-' সব দোষ আমার ' বলে স্বীকার করে নিলাম।
হিতেশদা হো হো করে হেসে উঠলো। আমরা আবার ভয় পেয়ে গেলাম।
--- আরে নারে না, ওটতো নকল সীতাহার ছিল আর এটা যে এক্কেবারে আসলী!
অবাক হয়ে আমরা চেয়ে আছি।
হিতেশদা জানালেন --
-- আমার পরিচিত অনেকেরই এই সীতাহারটার প্রতি লোভ ছিল। ওরা জানতো এটা আসল মুক্তো আর সোনা দিয়ে তৈরি এবং মহা মূল্যবান। নকল সীতাহার বাড়িতে রেখে গেলে চোর ভুল বুঝে উপদ্রব করতে পারে কারণ এটা এটতাই সুন্দর ছিল, তাই ওটিকে সরিয়ে রাখতেই চেয়েছিলাম। এখন দেখছি ভুল করে ফেলেছি। তোদের বিপদ দিলাম। আমাকে বন্ধু ভেবে একবার জানালে তোদের এই কষ্ট পেতে হত না। যাক অন্য আরো একদিক দিয়ে ভালোই হল -- কষ্টে -সৃষ্টে বৌদির একটা সোনার হার হয়ে গেল। বৌদিকে এটা সুন্দর মানাবে। এটা তোদেরই থাকবে। আমারটা নকল ছিল চোরেদের কাছে থাক। হা - হা - হা -
করে হেসে হিতেশ বিদায় নিল।
আমরা একেবারে বোকা বনে গেলাম দুজনায়।
আমি প্রনয়ী যার এত সাজার ইচ্ছা ছিল নিমেষের মধ্যে তা আমার মাথা থেকে বেড়িয়ে গেল। কিছুটা হাল্কা লাগলো। আর আমার দুষ্ট স্বামী প্রনয় আমায় তক্ষনাৎ সেই সীতাহার আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে পুরো সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই ছাড়লো।
ওরা দুজনই খুব ভাল তাই একটু আনন্দ করুক। আমাদের আর এগিয়ে লাভ নেই …
Labels: সাহিত্যপত্র
সীতাহার বিভ্রাট : প্রদীপ দে
সীতাহার বিভ্রাট : প্রদীপ দে: আমি প্রনয়ী সাজতে ভালোবাসি। ইচ্ছা আছে উপায় নেই। অভাবের ঠিক নয় তবে স্বচ্ছল পরিবারও নয়। স্বামী প্রাইভেট কোম্পানির এক চাকুরে। যা আয় হয় তাতে সংসার চলে যায় তবে বিশেষ কিছু জমে না। সখ আহ্লাদে কেরামতি করতে হয়। চাইলেই কিছু পাওয়ার নেই।
Labels: সাহিত্যপত্র
Saturday, 3 July 2021
গল্পঃ ভুতরহস্য
#ভুতরহস্যঃ
" প্রেম প্রতিশোধ "
প্রদীপ দে ~
-- প্রেম জীবন দেয় আবার নেয়ও।
-- সেটা কিরকম?
-- একটা স্বাভাবিক নিয়ম এটা। সব কিছুরই ভালোমন্দ যেমন থাকে এই আর কি!
-- তুমি এরকমই একটা ব্যাখ্যা দাও না --
হরিহরের দাঁড়িভর্তি মুখে একটি আকুতি - আমার কাছে।
-- সে না হোক বলবো - কিন্ত চা না হলেই যে নয় হরিদা ! দেখেছো আকাশ কালো হয়ে গুজরাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকে চমকে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। যেন বলছে সাবধান -সাবধান !
-- কিসের ভয় কিসের?
হরিহরের মুখে প্রশ্নের আর্তি।
-- হরিদা - দেখো, - বলতে বলতে বৃষ্টির খেলা শুরু হল। যে বাড়িতে আমরা দুজনে বসে আছি তার ইতিহাস তুমি জানো?
-- ইতিহাস ফিতিহাস আমি কিছু জানিনে। আমি শুধু বর্তমান জানি আমি এই ভাঙা কুটিরে ইয়াসের ঝড় জল এড়াতে দুদিন এসে জুটেছি। আমার বেড়ার কুটির এখন বিশবাও জলে। বৃষ্টি এখনো চলছে। কবে নিজের ডেরায় যেতে পারবো তা ঈশ্বরই জানেন। তবে হ্যাঁ একথা ঠিক তোমায় সঙ্গী হিসাবে পেয়ে ছিলেম বলে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে নিশ্চিত। না হলে এই জলাভূমিতে আর জংলি এই ভাঙা বাড়িতে আমি একা থাকতে পারতুম না। তুমিও আমার মত অসহায় হয়ে এসে আমায় সাথ দিলে তাই সাহস পেলুম!
-- আমি ও অসহায়। ঠিকই বলেছো। তাইতো ছুটে আসি অসহায় কে সাথ দিতে। বাইরে নির্জন জনমানব শুন্য। আমরা দুটি প্রাণী এই কুটিরে জীবন বাঁচতে খাদ্য পানীয়বিহীন হয়ে দিনযাপন করছি স্রেফ যে যার নিজের তাগিদেই।
আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিক ভেসে যাচ্ছে। ঝড় থামার পরেই চলছে এই বারিপাত। হরিহরের কাছে আজ আমি সব বলে দেবো পুরানো কথা। যা আমি জানি।
-- হরিদা - শোনো - বলছিলাম না প্রেম বড়ই পবিত্র। তবে এর পরিনতি সব সময় সুখের হয় না বা সার্থকতা লাভ করে না মাঝে মধ্যে অভিশস্পাত হয়েও ধরা দেয় বা ফিরে আসে।
হরিদার মুখ বিবর্ণ। ফ্যাকাশে নীল। একেবারে আকাশের মতোই। ঘোর ঘনঘটা। আমার দিকে ওর চোখ হাপিত্যেশ করে দেখতে চায় চাক্ষুষরূপে আমার বলা কথাকাহিনী।
-- সেও এক বর্ষাকাল। এই বাড়ি তখন ছিল একেবারে ঝাঁ চকমকে। চৌধুরীদের পৈতৃক ভিটে।
যৌথ পরিবার। আর তার স্বাদই যে আলাদা। তবে গ্রামের বাড়ি। লোক লস্করে ভর্তি।
বড় ভাইয়ের ছোট ছেলের বিয়ে। বাবা মুকুন্দকিশোর, পাত্র মনজিত আর পাত্রী অনুসূয়া। বউ আজ এসেছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। সানাই বাজছে। গ্রামের সকলের দুবেলা আহারের ব্যবস্থা চলছে মোট তিনদিনের জন্য। চেঁচামেচি - হৈচৈ ব্যাপার। নানান মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান চলছে নতুন বউকে নিয়ে। বউ ল্যাটা মাছ ধরবে তাই হাড়িতে চাপা দিয়ে মাছ রাখা রয়েছে। এয়োদের একজন যেই সেই হাঁড়ির মুখ খুলেছে ওমনি এক বিষধর কেউটে ফনা উঁচিয়ে ধরেছে। সে এক ভয়ানক পরিস্থিতি। বলে বোঝানো যাবেনা। ভয়ে কে কি করবে বুঝে ওঠার আগেই বাবা মুকুন্দকিশোর ক্ষিপ্র গতিতে তার হাতের লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে কেউটেটাকে। সাপটা ছিটকে পড়েও ফোঁস করে মাথা তুলতেই বাগানের মালী যুধিষ্ঠির গাছ কাটার সরু ধারালো দাঁ দিয়ে ওর মাথায় কোপ বসিয়ে দেয়। সাপটা মাটিতে তিনবার মাথা ঠুকে মারা যায়। ভন্ডুল হয়ে যায় সব অনুষ্ঠান। আকস্মিক এই ঘটনার জের চলতে থাকে। ভয়ে আর অমংগলের শব্দ যেন সকলকে বিচলিত করে। বারিধারা আরও জটিলতা সূচিত করে।
গ্রামের প্রবীণেরা বেশি জটিলতার সৃষ্টি করে। গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিবাহের রেশ কাটে না চৌধুরীর বড় কর্তা গুঞ্জনের শিকার হন। অসুস্থ হয়ে পড়েন। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।
বাড়ি ফাঁকা হলে নিস্তব্ধতার শক্তি বাড়ে। বাড়িতে যেন কারোর ঘুমরানো কান্নার আওয়াজ বয়ে যায়। আস্তে আস্তে সকলেই সেই আওয়াজ শোনে। গুনীন আসে ,গুনে বলে অতৃপ্ত আত্মা বাড়িতে কাঁদছে। সম্ভবত ওই সাপটি মহিলা ছিল এবং গর্ভবতী ছিল। গ্রামের লোকেরা তাই বিশ্বাস করে।
কিছুদিন বাদে মুকুন্দ শয্যাশায়ী থেকে মারা যান। ওই পরিবারের কুনজরে পড়ে গেছিলো অনুসূয়া। সবাই আড়ালে আবডালে তাকে কুলক্ষুনে বলতে লাগলো। কথা থেমে থাকে না। গ্রামে হু হু করে এ প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে যায়। তাই হলো।
যে নতুন বউ মহানন্দে ভালোবাসা দিয়ে সংসার সাজাতে বসেছিল তা তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে যায়। অনেক লড়াইয়ে স্বামীর মনেও সন্দেহ পাকাপোক্ত ভাবে বসে গেল।
অন্যদিকে যে যুধিষ্ঠির মালী সাপটাকে কাটারির কোপ বসিয়েছিল তার গিন্নিকেও একদিন এক বিষাক্ত সাপ দংশন করে।
ওঝার শত চেষ্টা তাকে বাঁচাতে পারেনি। কারণ সেটাও ছিল কালকেউটে। ওঝা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং স্বপ্নে আদেশ পায় সরে যেতে -- এ নাকি মৃত নারী-কেউটেটিরই জোড়া সাপ, পুরুষ-কেউটে। তার উদ্দেশ্য হলো এদের বংশ কে ধ্বংস করে দেওয়া। প্রেমিকার মৃত্যুর প্রতিশোধ। ভালোবাসা থেকে হিংসার জন্ম।
পঁনেরো দিনের মাথায় যখন যুধিষ্ঠির মালী তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দূরে শহরে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে, তখনই ঘুমের মধ্যেই তার ছেলেকে ছোবল বসিয়ে ছেড়েছে সেই ক্ষিপ্ত নাগ। স্বপনে তাকে এই দুঃখ বয়ে বেড়ানোর জন্য বাঁচিয়ে রেখে দিয়েছিল।
হরিহর চোখ মেলে আমাকে ভালো করে মাপলো কয়েকবার। ব্যাপারটা এইরকম তুমি এসব কথা জানলে কি ভাবে ?
আমি আমার মতো করে বলে যেতে থাকলাম, --
ওদিকে পুত্রবধূ ছিল আসন্ন প্রসবা। স্বামী মনোজিত তখন স্ত্রীর প্রতি অনেকটাই অনুরক্ত।
গর্ভবতী খবরে বংশবৃদ্ধির আশায় স্ত্রীকে নতুনভাবে ভালোবাসতে শুরু করেছিল। কিন্তু অনুসূয়া চেয়েছিল এই পরিবার কে আর তার স্বামীকে একটু শিক্ষা দিতে। প্রসবের সময় বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার ব্যবস্থা তাই আগেই করে রেখেছিল।
কিন্তু নিয়তি, ভাগ্য আর অভিশাপ এই তিন মেল্বন্ধনের জের তাকেও মেটাতে হলো ওই কাল কেউটের ছোবলেই। এতদিনে বোধহয় ওই কেউটে
শান্তি পেল তার প্রতিশোধে। তার গর্ভবতী স্ত্রীর মৃত্যু বদলা নিল, মনোজিতের স্ত্রী গর্ভবতী অনুসূয়া বৌয়ের মৃত্যু ঘটিয়ে।
এসব কথা জানা গেছিলো গুনীন মারফত। পুরুষ কেউটেটি পরপর বদলা নেওয়া চালিয়ে গেছে যতোক্ষন পর্যন্ত না, এই বংশের গর্ভবতী কোন মহিলার প্রান নিতে পেরছে। তবে ওই বাড়ির অভিযুক্ত আর অভিশপ্ত দুইজন পুরুষকে সে বাঁচিয়ে রেখেছিল স্রেফ নিজের স্বার্থেই। এই দুজনের একজন মনোজিত অন্যজন ওই মালী যুধিষ্ঠির। দুই ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রেখে তার পরিবারকে শেষ করে দিয়ে তার যন্ত্রনা বোঝাতে চেয়েছিল, যেমনটি সে পেয়েছিল। ভালোবাসা তার সার্থক। প্রেমের মৃত্যুর ক্রোধ আর তার প্রতিশোধ যার অন্য রূপ হিংস্রতা! এরপর থেকে ওই সাপকে আর কেউ দেখতে পায়নি।
হরিহর প্রশ্ন করে -- মনোজিতকে আমি চিনি। সে একজন জানি। যে সব ছেড়ে দেশান্তরে। বাড়ির অন্যান্যরা অনেকে আগেই মরে, পালিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু অন্যজন ওই যুধিষ্ঠির মালী কোথায় হারিয়ে গেল? তার আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে সব ছেড়ে পালিয়ে যাবে?
আমি নিরুপায়। আবার আজ আমায় সব বলে দিয়ে হালকা হতেই হবে -- এই ছিলো আমার ইচ্ছে। তাই বাকী না রেখে হরিহরের কাছে স্বীকার করেই নিলাম, ---
-- আমিই সেই দ্বিতীয়জন -- সেই বাগান মালী -- যুধিষ্ঠির !
------------------
#অমাদীপ_প্রদীপদে
Labels: সাহিত্যপত্র

