#ছোটহাসিরগল্পঃ
" পটীয়সী 'র পরকীয়া "
প্রদীপ দে ~
বেঁটে বকাই দৌড়ে এল। তখন আমরা বেশ কয়েকজন রামুর চায়ের দোকানে নড়বড়ে টেবিলটায় বসে এক হাতে চায়ের গ্লাস ধরেছি আর অন্য হাতে সিগারেট, চায়ে চুমুক দিয়েই সিগারেটের ধোওয়া গেলার অপেক্ষায় ইন্তেজার করছি, এমন সময়েই বকাইয়ের এই আগমন এক ভয়ংকর খবর নিয়ে, আমরা বিচলিত হয়ে পড়লাম। আমরা মানে তখন ওখানে গুলতানি মারছিলাম - লম্বু- গনেশ, ট্যারা- টুটুল, তোতলা- পুকাই, , পুচকে- সাহস, হাবলা- হরি আর আমি। আমার পরিচয় আমি ব্যাকা- বালু। আসলে এই পরিচিতি গুলো আমাদের গুলতানি সঙঘের কর্মকর্তা হিসাবে কার্যক্রম আমাদেরই করা কেরামতি আর প্রয়োগের কারুকাজ।
বেঁটে আমাদের দেওয়া নাম। ও উচ্চতায় ছোট তাই। আসলে বকাই। হাফাচ্ছে রীতিমতো।
-- আরে বলবি তো কি হয়েছে ?
-- দাঁড়া দাঁড়া ছুটে এসেছি আগে এক গেলাস জল পেটে ঢালি তারপর সব বলছি।
পুরো এক গাড়ু জল গিলে নিল।
-- পটলার বউ পটলাকে পেটাচ্ছে। প্রেম করে বিয়ে করা বউ কি মার মারছে রে। মরে না যায়!
আমরা তারস্বরে চিৎকার করে উঠলাম -- সে কিরে? এও সম্ভব? কি দিনকাল এলো রে? আগে তো আমরাই বউগুলাকে আচ্ছা কেলান কেলাতাম আর এখন কি হলো রে? বউরাই মারছে?
সবাই দৌড়ে গেলাম পটলার বাড়ি। বিপদে বন্ধুর পাশে থাকতে হয়। এটাই নিয়ম। না হলে কিসের বন্ধু? বাড়িতে পৌঁছে দরজায় কড়া নাড়তে যাবো দেখি দরজা দুহাত করে খোলা আর সামনে হাফপ্যান্ট পড়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের মুর্ত্তিমান পটলা পটল। আমাদের দেখেই তার কি কান্না - হাউমাউ করে
-- এসেছিস? বাঁচা তোরা!
কি করে বাঁচাই আর কিই বা হয়েছে? এদিক ওদিক উঁকিঝুঁকি মারছি যদি ওর বউ পটীর দেখা পাই।
-- এই যে সব নেশাখোরেরা এসে গেছেন দেখছি -
বলেই সুন্দরী বউ পটীয়সী ছুটে এলেন। আমরা কে কোনজনের আড়ালে যাবো তাই ভাবছি ।সে সুযোগ পেলাম না পটী কোমড়ে কাপড় গুঁজে তেড়ে এলো। পালাবো কিনা ভাবছি -কিন্তু পালাবার পথ নাই যম আছে পিছে -- ঘুরে দেখি -- ওর মা পিছনে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে চেয়ে আছে।
ওর বউয়ের অর্ডার ---
-- সব ভিতরে আসুন - কথা আছে।
ভয়ে গুটিগুটি ঘরে গেলাম। ঘর লন্ডভন্ড। একটু আগে এখানে একটা ঝড় বয়ে গেছে দেখলেই বোঝা যায়। আমারা এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে গেলাম।
বউ পটীয়সী ব্যঙ্গ করে বললে -- আপনাদের বন্ধু আবার নতুন করে প্রেম-প্রেম খেলা শুরু করেছেন?
বুঝলেন? বুঝলেন কিছু?
লম্বু গনেশের কিছু সাহস ছিল সেই উত্তর দিল --
-- সে কি? এ কেমন কথা? ঘরে এত সুন্দর বউ থাকতে এমনটা কেউ করে?
বউদির মুখ লাল হয়ে গেল। মানে কাজ হলো
-- বসুন না গনাদা।
আমরা সকলে মিলেই লম্বু গনেশকে নকল করলাম। বৌদি পটীয়সীর খ্যাতি করলাম। তোতলা পুকাই আবার এক কদম এগিয়ে পটলকে টেনে আনলো ঘরের ভিতর। তোতলানো সুরে বলার চেষ্টা করলো --
-- তু তু তু -ই এ এ এ এ -ম -অন কেন কেন কে নো ক কো কোরলি?
পুচকে সাহস দৌড়ে গেল। পুকাইকে
ঠেলে সরিয়ে দিল । বৌদির কাছে সাহস দেখিয়ে পটলার গালে চড় মারার মত আঙুল নিয়ে গেল আর চিল্লালো --
-- দেবো না ঠাটিয়ে একটা?
হাবলা হরিও কম গেল না -- দে দে ওকে? ও কি বন্ধু হতে পারে?
পটলার বউ পটীয়সী রে রে করে উঠলো।
-- থাক থাক খুব হয়েছে।
বেঁটে বকাই আর সাহস করে এগালো না।
বৌদি দেখলাম একমাত্র লম্বু গনেশকেই কেমন যেন পাত্তা দিল। হেসে হেসে বললে --
-- চা খাবেন গনেশ বাবু?
হয়ে গেল আমাদের! আমরা বাকীরা সব হলাম কাবু। গনেশ কায়দা করে পটল কে নিয়ে বেড়োতে চাইলো। বৌদিও রাজি হয়ে গেল। আমরা পটলা কে বাইরে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। আমার কেমন যেন মনে হলো বৌদির চোখে লম্বুর নেশা!
বাইরে বেড়িয়ে সকলে মিলেই পেটুক পটলাকে নিয়ে পড়লাম।
-- দ্যাখ কেমন বুদ্ধি খেলালাম। তোকে ভয় দেখিয়ে বৌদিকে বোকা বানালাম। পেটুক হেসে ফেললে -- তোরা তাই না আমার বন্ধু? এখন খুব খিদে লেগেছে চল কিছু পেটে দিই।
সব্বাই আমাদের রামহরির চায়ের ঠেকে গিয়ে নাস্তা বানালাম। খরচা পেটুক পটলা একাই বিল দিয়ে দিল।
এরকম ভাবেই আমরা চলছি। ভাবলাম পটলার পরকীয়ার ঘোর বুঝিবা কেটে গেছে। সপ্তাহ কাটলো না খবর এসে গেল আবার মারামারি। পটীয়সী পটলাকে মেরে চোখ ফুলিয়ে দিয়েছে। কি করা যায়? চায়ের দোকানের মালিক পথ বাতলে দিল -ও সব জানতো -আমরা যে সব আলোচনা ওখানেই সারি। রামহরি বললে --
-- আপনাগো গিয়ে কাম নাই। এক কাম সারেন ওই লম্বুটারে ওহানে পাঠায়ে দেন -ওরে খাতির করে পটী।
একদমই ঠিক কথা। ভেবে বলেছেন। আমরা ভাবতেও পারিনি। লম্বু গনেশেরেই ধরলাম। ও কিছুতেই যাবে না। অনেক বুঝিয়ে রাজী করালাম।
গনেশ ঘুরে এসে জানালো পটলের স্বভাব খারাপ।
কচি মেয়ে দেখলেই পটানোর ধান্ধা করে। এবারে ও ম্যানেজ করেছে। পটলা নাক-কান খৎ দিয়েছে।
বলেছে আর করবে না।
অবাক কান্ড আবার পটলা পাড়ার এক মাসিকে নিয়ে লটরপটরে জড়িয়ে পড়লো। কি ঝামেলা?
আবার গনেশের হাতে পায়ে ধরে পাঠালাম। বউয়ের হাতে বন্ধু মার খাবে এটা দেখা যায়?
তবে পটলাকে বলে দিলাম --
-- এই কিন্তু শেষবার।
গনেশ পটীয়সী কে বোঝাচ্ছে -
-- এইবার ওকে শেষবারের মত ছাড় দিন । ও কথা দিয়েছে, কোনোদিন এরকম করবে না।
বৌ পটীয়সী গনেশকে পছন্দ করায় রাজী হয়ে গেল। তবে একটি শর্তে। --
-- আর একবার খবর হলেই আমি সুযোগ পেয়ে যাবো আর আমিও দেখিয়ে দেবো পরকীয়া কাকে বলে!
পটলা রাজী হয়ে গেল। আর গনশা বেশ ফুরফুরে মেজাজে পাড়ার হিরো হয়ে গেল। দেখলাম মাঞ্জা দেওয়া রঙিন পাঞ্জাবি গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মহিলাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে গেছে। পটলাকে দেখলেই গালি মারছে।
বেশিদিন গেল না পেটুক পটলা খবর হয়ে গেল। পাশের পাড়ার রামকানাইয়ের মেয়ের হাতির হাতে জুতোপেটা খাচ্ছে। স্পাই মারফত বউ পটীয়সীর কাছে খবরও চলে যেতে সময় নিল না। আমরা সবাই ভাবছি কি হয়? -কি হয়? লম্বু গনশার খবর নেই। যদিও ও আর যাবে না। তবুও সব্বাই ওকে চাইছি। না সারাদিন কেটে গেল রাত দশটা বেজে যেতেই আমরা যে যার বাড়ির দিকে পা বাড়াচ্ছি - এমন সময় পটলা দৌড়ে এলো --
-- বিপদ হয়ে গেছে ভাই। আমার বউ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
সবাই তারস্বরে চিৎকার করে উঠলাম। --
-- সে কি রে? কিন্তু কোথায় গেছে জানিস?
পেটুক পটলা কাঁদছে --
-- না তা জানিনা। তবে একটা চিঠি লিখে রেখে গেছে। এখন বালিশের তলা থেকে পেলাম।
-- সে কি রে? পড়, আগে পড় শুনি।
-- হ্যাঁ। পড়ছি --লিখেছে --
-- " বলেছিলাম না পরকীয়া কাকে বলে দেখিয়ে ছাড়বো - এবার দ্যাখো কেমন লাগে --আমি তোমারই বন্ধু লম্বু গনশাদাকে নিয়ে ভাগলাম। পারলে কিছু করো। আমরা দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসি - ছেড়ে থাকতে পারছি না --তাই তোমাকেই ছেড়ে চলে গেলাম। খোঁজ করে লাভ নেই, আমরা স্বেচ্ছায় পালালাম। পরে সুবিধা মতো তোমার কাছে উকিলের নোটিশ পাঠাবো আর খোরপোশ সহ সব পাওনাগন্ডা আদায় করে তবে আমি তোমায় ছাড়বো -এই বলে রাখলুম তোমায়।
-- ইতি , -- তোমার নয়, এখন আমি গনশার পটীয়সী।
~~~~~